বুধবার, 21 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

বিগত কয়েক দশকে পৃথিবীজুড়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিগত ২০২৪ সালে এসে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে নতুন এক ইতিহাসের সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে এই মারাত্মক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে

বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা
ছবি : সংগৃহীত

বিগত কয়েক দশকে পৃথিবীজুড়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিগত ২০২৪ সালে এসে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে নতুন এক ইতিহাসের সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে এই মারাত্মক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এই মশাবাহিত রোগটি এখন আর শুধু নির্দিষ্ট গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন ইউরোপ এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মতো সম্পূর্ণ নতুন নতুন ভৌগোলিক এলাকায় অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, ২০২৪ সালে ইউরোপের তিনটি উন্নত রাষ্ট্র—ফ্রান্স, ইতালি এবং স্পেনেও স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী ১ কোটি ৪৬ লাখেরও বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন এবং অন্তত ১২ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্বের ৯৭টি দেশ থেকে আরও ৪০ লাখের বেশি নতুন রোগী এবং ৩ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো বেশ মৃদু প্রকৃতির হয়ে থাকে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে রোগটির শুরুতেই সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এর সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উচ্চমাত্রার জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনের অংশে প্রচণ্ড অস্বস্তি এবং মাংসপেশি ও হাড়ের সংযোগস্থলে তীব্র ব্যথা। এছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে বমি বমি ভাব ও শরীরে লালচে ধরনের র‍্যাশ বা দাগ দেখা দিতে পারে। রোগ থেকে সাময়িকভাবে সেরে ওঠার পরও অনেক রোগীর শরীরে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে তীব্র শারীরিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু অত্যন্ত জটিল রূপ ধারণ করতে পারে, যা রোগীর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। তাই কিছু নির্দিষ্ট জরুরি লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই রোগীকে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। এই বিপজ্জনক উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে পেটে তীব্র ব্যথা, অনবরত বমি হওয়া, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া, মাড়ি, নাক বা শরীরের অন্য কোনো অংশ দিয়ে রক্তক্ষরণ হওয়া, রক্তবমি অথবা মলের সাথে রক্ত যাওয়া। এছাড়া তীব্র তৃষ্ণা, প্রচণ্ড অবসাদ এবং ত্বক ফ্যাকাশে বা অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়াও আশঙ্কাজনক লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে, ডেঙ্গু নিরাময়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল বা ওষুধ এখনো আবিষ্কার হয়নি। তাই আক্রান্ত রোগীর প্রধান চিকিৎসা হলো সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকা এবং শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করতে প্রচুর পরিমাণে পানি, ওরস্যালাইন ও বিভিন্ন ধরনের তরল খাবার গ্রহণ করা। ব্যথানাশক বা জ্বর কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে কেবল প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সেবন করা যাবে। কোনো অবস্থাতেই আইবুপ্রোফেন বা অ্যাসপিরিনের মতো নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ক্যাটাগরির ওষুধ খাওয়া যাবে না, কারণ এগুলো সেবনে শরীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।

যেহেতু ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা মূলত দিনের বেলায় বেশি কামড়ায়, তাই নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে কিছু প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরিধান করা, দিনের বেলা ঘুমানোর সময়ও বাধ্যতামূলকভাবে মশারি ব্যবহার করা এবং ঘরের জানালায় নেট লাগানোর পাশাপাশি মশা তাড়ানোর স্প্রে বা কয়েল ব্যবহার করা। এছাড়া মশার প্রজননস্থল পুরোপুরি ধ্বংস করতে ঘর, ছাদ ও আঙিনায় জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত আবশ্যক।

বর্তমানে বিশ্বের বেশ কিছু দেশে 'কিউডেঙ্গা' নামের একটি ডেঙ্গু প্রতিরোধী টিকা অনুমোদিত হলেও, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটি কেবল ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সুপারিশ করেছে। ফলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে সংস্থাটি বিশেষ তাগিদ দিয়েছে।