ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের মধ্যে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে বসছে BRICS সম্মেলন। একই টেবিলে থাকবেন ইরান, চীন, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত একাধিক দেশের শীর্ষ নেতারা। ফলে এবারের সম্মেলন শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠক নয়; যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় BRICS কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
গত ৩ সেপ্টেম্বর কুয়েতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। এর দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ উপকূল ও পশ্চিম ইরানের প্রায় ১০০টি অবস্থানে হামলা চালায়। এসব হামলার মধ্যে সিরিক শহরের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে চালানো হামলায় পাঁচজন নিহত হন।
এরপরও দুই দেশের সংঘাত থামেনি। মার্কিন বাহিনী ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। পাল্টা ইরান হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৭ ডলারে উঠেছে।
দিল্লিতে মুখোমুখি সংঘাতের একাধিক পক্ষ
১২ সেপ্টেম্বর BRICS সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লিতে পৌঁছাবেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। সম্মেলনে থাকবেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও।
BRICS-এর ১১ সদস্য দেশের মধ্যে অন্তত আটটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান সম্মেলনে অংশ নেবেন। ইরানের হামলার শিকার সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই বৈঠকে উপস্থিত থাকবে।
পশ্চিমা বিশ্লেষণের একটি অংশ BRICS সম্মেলনকে কেবল আনুষ্ঠানিক আয়োজন হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, এত বৈচিত্র্যময় সদস্য নিয়ে গঠিত এই জোটের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন। তবে গত ছয় মাসের সংঘাতের ঘটনাপ্রবাহে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতির উদ্যোগগুলোতে BRICS সদস্য ও তাদের অংশীদার দেশগুলোর ভূমিকা ছিল।
ইসলামাবাদ সমঝোতার কি হলো?
গত ৩১ মার্চ চীন ও পাকিস্তান পাঁচ দফা একটি উদ্যোগ নেয়। এতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এর এক সপ্তাহ পর ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এরপর ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা সরাসরি আলোচনায় বসেন। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বে ওই আলোচনা হয়। দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও দুই দফা তেহরান সফর করেন।
এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম’। ১৭ জুন ভার্সাইয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মাসউদ পেজেশকিয়ান এতে স্বাক্ষর করেন। কাতার, ওমান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরও এর বিভিন্ন অংশ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখে।
১৪ দফার ওই সমঝোতায় ৬০ দিনের জন্য শুল্কমুক্ত চলাচল, ৩০ দিনের মধ্যে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল।
তবে প্রথম ও পঞ্চম ধারা নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে সমঝোতাটি কার্যকর রাখা সম্ভব হয়নি। কোনো মধ্যস্থতাকারীও দুই পক্ষকে অভিন্ন অবস্থানে আনতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ১৭ আগস্ট এর মেয়াদ শেষ হয়।
মধ্যস্থতায় চীনের স্বার্থ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে চীনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বেইজিং ইরানের রপ্তানি করা অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি আমদানি করে। একই সঙ্গে ইরানের হামলার শিকার উপসাগরীয় দেশগুলো থেকেও চীন বিপুল পরিমাণ তেল কেনে। মার্চে এসব উপসাগরীয় দেশ থেকে চীনের আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ কমে যায়।
তবে চীনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ইরানকে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য উপাদান, রাডার ও নেভিগেশন সরঞ্জাম এবং একটি বাণিজ্যিক গোয়েন্দা স্যাটেলাইট সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এর বাইরেও সরবরাহের তালিকা আরও দীর্ঘ। তবে চীন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এ ছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কুয়েত ও বাহরাইনের বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং কাতারের বেসামরিক নাগরিক আহত হলেও এ বিষয়ে চীনের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া সীমিত ছিল। উপসাগরীয় অঞ্চলে বেইজিংয়ের গ্রহণযোগ্যতার জন্য এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কতটা কঠোর?
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত অবসানে নতুন কোনো সমঝোতার পরিবর্তে হরমুজ প্রণালির ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অবস্থান নিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রায় ৮০ শতাংশ THAAD ইন্টারসেপ্টর এবং প্রায় সব ATACMS ও Precision Strike Missile ব্যবহার করেছে।
যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর। যুদ্ধের শুরু থেকেই কুয়েতের বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে। ওমান সমঝোতার ভিত্তিতে জাহাজ চলাচলের বিকল্প পথ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। কাতার নিজে হামলার শিকার হওয়ার পরও যোগাযোগের একটি চ্যানেল সচল রেখেছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও দ্রুত বাড়ছে। ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) চলতি বছর দেশটির অর্থনীতি ৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে।
যুদ্ধের পাশাপাশি ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক অবকাঠামো থেকে বিচ্ছিন্নতাও ইরানের অর্থনীতিতে চাপ বাড়িয়েছে। একই ধরনের চাপ এর আগে রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা ও আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।
এদিকে বিকল্প আন্তর্জাতিক লেনদেনব্যবস্থা গড়ে তোলার তৎপরতা বাড়ছে। চীনের আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থায় এক দিনে রেকর্ড ১ দশমিক ২২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান লেনদেন হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১৭৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। মার্চে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল।
বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থায় BRICS-এর উদ্যোগ
BRICS-এর বর্তমান চেয়ারম্যান ভারত সদস্য দেশগুলোর দ্রুতগতির পেমেন্ট ব্যবস্থাগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় ভারতের UPI ও ব্রাজিলের Pix-এর মতো ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে কাজ চলছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা এটিকে সংঘাতের পরিবর্তে লেনদেনের খরচ কমানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
তবে এসব বিকল্প ব্যবস্থার সক্ষমতা এখনো সীমিত। SWIFT-এর মাধ্যমে বৈশ্বিক লেনদেনে ইউয়ানের অংশ ৩ শতাংশেরও কম, যেখানে ডলারের অংশ ৫১ শতাংশ। চীনের CIPS ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৭৯১টি; বিপরীতে SWIFT-এর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার।
অর্থাৎ চলতি দশকেই ডলারের আধিপত্য শেষ হয়ে যাবে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রতি বিভিন্ন দেশের আগ্রহ যে বাড়ছে, তা স্পষ্ট।
ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা
ভারতের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও এই পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরে। ফেব্রুয়ারিতে ৫০ শতাংশ শুল্কের চাপের মুখে নয়াদিল্লি রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করতে সম্মত হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র শুল্কের হার কমিয়ে ১৮ শতাংশ করে।
এতে দেখা যায়, দ্বিপক্ষীয় চাপ একেকটি দেশের ওপর কার্যকর হতে পারে। BRICS-এর ক্ষেত্রে অভিন্ন অর্থনৈতিক অবকাঠামো সেই চাপ মোকাবিলার একটি সম্ভাব্য উপায় হয়ে উঠতে পারে।
দিল্লির বৈঠক কেন কঠিন
গত মে মাসে BRICS পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক কোনো যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চেয়েছিলেন, বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের নিন্দা করা হোক। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত এতে স্বাক্ষর করতে রাজি হয়নি।
অন্যদিকে, ১ সেপ্টেম্বর বিশকেকে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বৈঠকে ইরানের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে একটি ঘোষণা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।
তবে দিল্লির পরিস্থিতি আলাদা। এখানে সংঘাতের বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ একই টেবিলে থাকবে। ফলে ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন হলেও এ কারণেই বৈঠকটির গুরুত্ব আরও বেশি।
কী অর্জন করতে পারে BRICS
নয়াদিল্লি সম্মেলনে বড় কোনো চুক্তির পরিবর্তে কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের মধ্যে নৌ চলাচল নিয়ে সমঝোতা হলে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমাতে তা ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া ইসলামাবাদ সমঝোতার আওতায় থাকা পুনর্গঠন পরিকল্পনা নতুন করে কার্যকর করার উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। BRICS-এর সদস্য দেশগুলো সম্মিলিতভাবে এ ধরনের অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিলে এর আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে আন্তঃদেশীয় পেমেন্ট ব্যবস্থার সংযোগ স্থাপনে নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হলে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার বাস্তব অগ্রগতির বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এখন নয়াদিল্লির BRICS সম্মেলনেই নির্ধারিত হতে পারে, সংঘাত নিরসন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে অন্য দেশগুলো কী অবস্থান নেয়।
সূত্র: আল জাজিরা