শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

চীনে সমাধিতে মিলল ২০০০ বছর আগের ‘কম্পিউটার

আধুনিক কম্পিউটারের ইতিহাস কি তবে নতুন করে লিখতে হবে? কম্পিউটার মানেই কি কেবল ইলেকট্রনিক চিপ আর বিদ্যুৎ? বিজ্ঞানীদের নতুন এক আবিষ্কার এই চিরাচরিত ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে। পশ্চিম চীনের একটি প্রাচীন সমাধিতে ২ হাজার বছর পুরোনো এক বিস্ময়কর যন্ত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা আধুনিক কম্পিউটারের আদি রূপ হতে পারে বলে দাবি করছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। ‘তি হুয়া জি’ বা অলংকৃত তাঁত নামের এই যন্ত্র মূলত ‘বাইনারি’ বা দ্বিমিক পদ্ধতিতে কাজ করত, যা আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

চীনে সমাধিতে মিলল ২০০০ বছর আগের ‘কম্পিউটার
ছবিঃ সংগৃহীত

আধুনিক কম্পিউটারের ইতিহাস কি তবে নতুন করে লিখতে হবে? কম্পিউটার মানেই কি কেবল ইলেকট্রনিক চিপ আর বিদ্যুৎ? বিজ্ঞানীদের নতুন এক আবিষ্কার এই চিরাচরিত ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে। পশ্চিম চীনের একটি প্রাচীন সমাধিতে ২ হাজার বছর পুরোনো এক বিস্ময়কর যন্ত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা আধুনিক কম্পিউটারের আদি রূপ হতে পারে বলে দাবি করছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। ‘তি হুয়া জি’ বা অলংকৃত তাঁত নামের এই যন্ত্র মূলত ‘বাইনারি’ বা দ্বিমিক পদ্ধতিতে কাজ করত, যা আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

চায়না অ্যাসোসিয়েশন ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বা কাস্টের (সিএএসটি) বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রাচীন যন্ত্রটি আজকের কম্পিউটারের মতোই ‘ইনপুট-আউটপুট’ এবং ‘প্রোগ্রামিং’ নীতিতে পরিচালিত হতো। ২০১২ সালে ছেংদু শহরের মেট্রো লাইন নির্মাণের সময় পশ্চিম হান রাজবংশের একটি সমাধি থেকে চারটি তাঁত যন্ত্রের মডেল উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ এক দশকের গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এখন নিশ্চিত করেছেন যে, খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০ অব্দের সেই যন্ত্রটি ছিল পুরোপুরি ‘প্রোগ্রামেবল’। আধুনিক কম্পিউটারে যেমন নির্দিষ্ট কাজের জন্য সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়, এই তাঁত যন্ত্রে তেমনি সুতার নকশা নির্দেশ করতে ‘প্যাটার্ন কার্ড’ ব্যবহার করা হতো। এই কার্ডগুলোই মূলত যন্ত্রটিকে নির্দেশ দিত কোন সুতাটি ওপরে উঠবে আর কোনটি নিচে নামবে।

ডিজিটাল দুনিয়ার ভাষা হলো ০ ও ১ এর সমন্বিত বাইনারি ক্যালকুলেশন। বিস্ময়করভাবে এই প্রাচীন চীনা যন্ত্রে কোনো সুতা ওপরে উঠলে তাকে ‘১’ এবং নিচে নামলে তাকে ‘০’ হিসেবে গণ্য করা হতো। এভাবে ৯৬ লাখ সুতার সংযোগস্থল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অত্যন্ত জটিল নকশা তৈরি হতো, যা বর্তমানের বাইনারি লজিকের এক প্রাচীনতম সংস্করণ। দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হতো বিজ্ঞান ও কম্পিউটিংয়ের জন্ম আধুনিক ইউরোপে। ১৯৪৬ সালে পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি ‘এনিয়াক’কে বিশ্বের প্রথম ইলেকট্রনিক কম্পিউটার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে নতুন এই গবেষণায় সিএএসটি দাবি করছে, চীনা কারিগররা ২ হাজার বছর আগেই অটোমেশন ও তথ্য সংরক্ষণের উচ্চতর বিদ্যা আয়ত্ত করেছিলেন।

ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, চীনের এই অভিনব প্রযুক্তি রেশম পথ বা সিল্ক রোড ধরে পারস্য হয়ে ইউরোপে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ১২তম শতাব্দীতে ইতালির ভেনিসে এই প্রযুক্তির তাঁত ব্যবহার শুরু হয়। ১৮০৫ সালে ফরাসি কারিগর জোসেফ ম্যারি জ্যাকোয়ার্ড এই প্রাচীন ধারণা থেকেই ‘পাঞ্চ কার্ড’ নিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় তাঁত উদ্ভাবন করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ফরাসি উদ্ভাবকের সেই ‘পাঞ্চ কার্ড’ পদ্ধতিই ১৯ শতকের শুরুর দিকের কম্পিউটারগুলোতে প্রোগ্রামিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। এমনকি কার্ল মার্ক্স তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে এই জ্যাকোয়ার্ড তাঁতকে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আগে বিশ্বের সবচেয়ে জটিল যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

আধুনিক কম্পিউটিংয়ের ইতিহাসে এই আবিষ্কার আরও গভীর যোগসূত্র স্থাপন করেছে। ১৯৪৬ সালে প্রথম আধুনিক কম্পিউটার ‘এনিয়াক’ তৈরির দলে অন্যতম প্রধান সদস্য ছিলেন চীনা বিজ্ঞানী ঝু চুয়ানজু। অনেক গবেষক মনে করেন, ঝু তাঁর লজিক্যাল স্ট্রাকচার ডিজাইনে প্রাচীন চীনের এই তাঁত প্রযুক্তি এবং ‘আই চিং’ দর্শনের বাইনারি তত্ত্বের অনুপ্রেরণা কাজে লাগিয়েছিলেন। চীনের বিজ্ঞান জাদুঘরের সাবেক পরিচালক ওয়াং ইউশেংয়ের মতে, এই তাঁত যন্ত্রটি কেবল বস্ত্রশিল্পের সরঞ্জাম নয়, বরং এটি প্রাচীন প্রোগ্রামিং চিন্তা ও যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার এক অনন্য নিদর্শন। এটিই নেপথ্যে থেকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মৌলিক নীতিগুলো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।