রবিবার, 25 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ডিলিমিটেশন বিল ঘিরে ভারতে নতুন তৎপরতা

ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন বিলকে কেন্দ্র করে নতুন করে যে তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে, তা কেবল সাধারণ কোনো আইন পাসের প্রক্রিয়া নয়।

ডিলিমিটেশন বিল ঘিরে ভারতে নতুন তৎপরতা
ছবি : সংগৃহীত

ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন বিলকে কেন্দ্র করে নতুন করে যে তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে, তা কেবল সাধারণ কোনো আইন পাসের প্রক্রিয়া নয়।

মূলত ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে আনার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল এটি। এর আগে আইনসভায় এই বিল পাসের চেষ্টা ব্যর্থ হলেও, এবার ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরাসরি সংখ্যার শক্তিতে না গিয়ে আঞ্চলিক দলগুলোকে পাশে পাওয়ার নতুন কৌশল অবলম্বন করছে।

গণমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর তথ্যমতে, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সাফল্যের পর ক্ষমতাসীন শিবিরের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। এর জেরে তারা ডিলিমিটেশন এবং ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে একসঙ্গে সামনে এনে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে এই প্রস্তাবটি এখন আর কেবল সাংবিধানিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং আঞ্চলিক দলগুলোর অবস্থান এবং বিরোধী জোটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংসদে আগেরবার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়ে ধাক্কা খাওয়ার পরও বিজেপি এই বিলের বিষয়ে পিছু হটেনি। ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগেই তারা এটি কার্যকর করার পাশাপাশি দেশজুড়ে একযোগে নির্বাচন প্রক্রিয়া চালুর দিকে ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। তবে এবার সরাসরি দ্বন্দ্বে না গিয়ে আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার নীতি নেওয়া হচ্ছে, যা স্পষ্ট করে যে আইনসভায় সংখ্যার ঘাটতি থাকলেও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে তা পুষিয়ে নিতে চায় শাসক দল।

এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দক্ষিণ ভারতের ডিএমকে এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হলে স্বাভাবিকভাবেই উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোর আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে তামিলনাড়ুর মতো দক্ষিণের রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ডিএমকে শুরুতে এর কঠোর বিরোধিতা করলেও, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ধাক্কার পর এখন তাদের সুর কিছুটা নরম হয়েছে এবং দলের অভ্যন্তরে ‘শর্তসাপেক্ষ আলোচনার’ গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, আগেরবার কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের জোট থাকলেও, সাম্প্রতিক নির্বাচনে তারা বিজয় থালাপাতির দল টিভিকে সরকার গঠনে সমর্থন দেওয়ায় কংগ্রেসের ওপর একধরনের অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এমতাবস্থায় কেন্দ্র যদি দক্ষিণের রাজ্যগুলোর আসন সংখ্যা অপরিবর্তিত রাখার সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দেয়, তবে ডিএমকে সরাসরি বিরোধিতা থেকে সরে আসতে পারে এবং বিজেপি ঠিক এই রাজনৈতিক সুযোগটিই কাজে লাগাতে চাইছে।

অপরদিকে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস বর্তমানে বেশ চাপের মুখে রয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফলের পর নানামুখী প্রলোভনে দলীয় ভাঙন, নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষ এবং জনরোষের কারণে কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থানে রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। বিজেপির জন্য এটি একটি বড় সুযোগ, কারণ সংসদে যদি তৃণমূল দুর্বল হয়ে পড়ে বা দলটিতে ফাটল ধরে, তবে ডিলিমিটেশন বিল পাস করানো অনেকটাই সহজ হবে। বাংলায় জয়ের পর বিজেপির নানামুখী আগ্রাসী অবস্থান থেকেই তাদের এই বাড়তি আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস এখনও বিলটির বিরুদ্ধে নিজেদের কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে এবং একটি সর্বদলীয় আলোচনার দাবি জানাচ্ছে। তবে বাস্তবে ইন্ডিয়া (INDIA) জোটের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে কংগ্রেস এককভাবে কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে। ডিএমকে যদি নমনীয় রূপ ধারণ করে এবং তৃণমূল আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে বিরোধী জোটে ফাটল ধরার আশঙ্কা রয়েছে, যা প্রকারান্তরে বিজেপির পথকেই মসৃণ করবে।

এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ বিলটিকেও সামনে আনা হচ্ছে, যা মূলত একটি বৃহৎ রাজনৈতিক প্যাকেজের অংশ। একদিকে প্রশাসনিক সংস্কারের যুক্তি এবং অন্যদিকে বিরোধীদের কোণঠাসা করার কৌশল—এই দুই নীতিতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করে বিজেপি আসলে বিরোধীদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে দিতে চাইছে।

সার্বিকভাবে, ডিলিমিটেশন বিলটি এখন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রস্তাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ভারতের রাজনীতিতে এক বড় দাবা খেলায় রূপ নিয়েছে, যেখানে আঞ্চলিক দলগুলোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই ফলাফল নির্ধারণ করবে। পশ্চিমবঙ্গে জয়ের পর বিজেপি এটি স্পষ্ট বুঝে গেছে যে, রাজ্যভিত্তিক দুর্বলতাকে পুঁজি করেই জাতীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাই এই নতুন উদ্যোগ কেবল একটি বিল পাস করানোর চেষ্টা নয়, বরং ২০২৯ সালের আগেই দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার একটি সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ।