ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, শুধু পোশাক-পরিচ্ছদ বা কথাবার্তার ধরন দিয়ে জ্ঞানী বা আলিম হওয়া যায় না; প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের মধ্য দিয়েই সেই পরিচয় তৈরি হয়। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ফোরামের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ফজলুর রহমান বলেন, ‘তোমরা জ্ঞান অর্জন করো। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সিনিয়র মাদ্রাসায় পরিণত করো না। পোশাক এবং ভাষাই শুধু মানুষের প্রকৃতি নির্ধারণ করে না। পাঞ্জাবি, পায়জামা আর টুপি পরলেই কেউ আলিম হয় না, আলিম হতে গেলে এলেম জানতে হয়।’
ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে বেহেশত-দোজখের টিকিট বিক্রি করা হয়। আর কেউ কিনতে না চাইলে তাকে খারাপ বানিয়ে দেওয়া হয়।’
রাজনীতি, ধর্ম ও ধর্মব্যবসাকে একই বিষয় হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সত্য কথা বলব, ন্যায়ের পথে চলব, আল্লাহ-রাসুলের দেখানো পথে চলব, কিন্তু ধর্মব্যবসা করব না।’
সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করে ফজলুর রহমান বলেন, ‘সাম্প্রদায়িকতা ভারতবর্ষের সবচেয়ে সর্বনাশা আদর্শ। এই আদর্শকে পরাজিত না করা পর্যন্ত মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন করতে হবে।’
কাজী নজরুল ইসলামের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রসঙ্গও বক্তব্যে তুলে ধরেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, নজরুলের এই চেতনার সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর ভাষায়, নজরুল সত্যবাদী ও প্রকৃত মানুষ ছিলেন এবং তাঁর চেতনার কারণে তিনি ‘মরে গিয়েও হাজার বছর বেঁচে থাকবেন’।
এ সময় ১৯২৯ সালে জিন্নাহর ঘোষিত ১৪ দফার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই দাবিগুলোর মধ্যে মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক বিষয় ছিল।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাঙালি নেতাদের ভূমিকার প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান বলেন, ‘পাকিস্তান আমরা সবাই মিলেই বানাইছিলাম, আমরা তো অস্বীকার করি না। কিন্তু বানাইয়া যখন দেখলাম পাকিস্তান ভালো না, তখন ৫২ সালেই আমরা ফাইট শুরু করলাম।’
এরপর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার আন্দোলনের বিভিন্ন ধাপ তুলে ধরেন তিনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের শাসন, পরবর্তী সময়ে ছয় দফা ও ১১ দফা এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে তিনি স্বাধীনতার আন্দোলনের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান বলেন, ‘সারা পাকিস্তানে মেজরিটি ভোট পায় শেখ মুজিবুর রহমান। এরপরও ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় যুদ্ধ শুরু হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।’
নিজের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার স্মৃতিও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমার বয়স তখন ২৩ বছর। আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম। যুদ্ধে যাই নাই শুধু, যুদ্ধকে সংগঠিত করেছিলাম।’
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তৈরির সময় উপস্থিত থাকার দাবিও করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘বাংলাদেশের পতাকা যে রাতে তৈরি হয়েছিল, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। শিব নারায়ণ দাসের ঘনিষ্ঠ কর্মী ছিলাম আমি।’
মুক্তিযুদ্ধের পেছনে অস্ত্রের পাশাপাশি আদর্শের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দিস ইজ নট দ্য আর্মস দ্যাট ফাইটস্, বাট দ্য ম্যান বিহাইন্ড দ্য আর্মস, অ্যান্ড আইডোলোজি বিহাইন্ড দ্য ম্যান দ্যাট ফাইটস্।’
জাতীয় পতাকা ও ‘আমার সোনার বাংলা’ গান নির্বাচনের সময়কার স্মৃতিও বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সমালোচনা করে ফজলুর রহমান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধই সত্য। যখন কেউ বলছে মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই, তখন সে কথা আমার বুকে লাগছে।’
কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ফোরাম আয়োজিত নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন। অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা, রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) খন্দকার নাজমুল হাসান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম বেগম, কিশোরগঞ্জ জেলা পাবলিক কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম, শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব এবং সদস্য সচিব মামুন সরকার।