ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো থেকে লোহিত সাগরের উপকূলকে বিচ্ছিন্ন করতে কৌশলগত উচ্চভূমি ‘দখলের দিকে’ এগোচ্ছে হুতি যোদ্ধারা। এর মধ্যেই ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিলেও শেষ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা ‘বাতিল করেছেন’।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের নতুন করে অনুরোধের পর ট্রাম্প প্রশাসন রোববার হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল। এমনকি বিমানগুলোতে বোমা তোলার কাজও চলছিল। তবে শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প হামলা বাতিল করেন।
চলতি মাসে ইরান-সমর্থিত হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত সৌদি আরবেও ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপরও তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি। ইয়েমেনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত করার জন্য সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বারবার আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন তাতে সাড়া দেয়নি।
রয়টার্স লিখেছে, হুতিদের ওপর মার্কিন হামলার প্রস্তুতি নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের খবর তাৎক্ষণিকভাবে তারা যাচাই করতে পারেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড হোয়াইট হাউজের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। তবে হোয়াইট হাউজ মন্তব্য চেয়ে পাঠানো ই-মেইলের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি।
রয়টার্সকে চারটি সূত্র জানিয়েছে, ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট রশিদ আল-আলিমি রোববার ফোনে ট্রাম্পের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়েছেন। সূত্রগুলোর মধ্যে একজন ইয়েমেনি ও একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেছেন, ওই ফোনালাপে ট্রাম্প সরাসরি কোনো সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেননি।
এদিকে শনিবার প্রথমবারের মতো সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও হামলা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে বিমানবন্দরের কাছে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ধোঁয়া দেখা যায়। হুতিরা দাবি করেছে, তারা সৌদি রাজধানী লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
উচ্চভূমিতে লড়াই
২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণে রাখা হুতিরা চলতি মাসে দেশটির লোহিত সাগর উপকূলের একটি বড় অংশ দখলে নেয়। তাদের এই অগ্রযাত্রায় সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।
হুতিদের দাবি, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি আরব তাদের উচ্চভূমিতে থাকা অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে শুরু হওয়া এই লড়াইয়ে প্রায় ৭০০ মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ইয়েমেনি দেশের ভেতরেই নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। আরও ৩ হাজারের বেশি মানুষ নৌকায় করে লোহিত সাগর পেরিয়ে আফ্রিকায় চলে গেছেন।
রয়টার্সকে ইয়েমেনের পাঁচজন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হুতিরা এখন তাইজ ও লাহিজ প্রদেশের কৌশলগত উচ্চভূমি দখলের চেষ্টা করছে। এসব এলাকার মধ্যে কাহবুব পর্বতমালাও রয়েছে। এই পর্বতমালা লোহিত সাগরের উপকূলকে দক্ষিণাঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা থেকে আলাদা করেছে।
তাইজ প্রদেশের দুর্গম আল-ওয়াজিয়াহ জেলার উপকণ্ঠে এবং ভারত মহাসাগর উপকূলের রাস আল-আরা এলাকায় লড়াই চলছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তারা। রাস আল-আরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং সরকারি বাহিনীর ঘাঁটি এডেনের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত।
ইয়েমেনের অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও বর্তমানে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করা মোহাম্মদ আল-কাদি বলেন, বাব আল-মান্দেব এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সরকারি বাহিনী মূলত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাপক বিমান হামলার মুখেও হুতিরা তাদের অগ্রযাত্রার গতি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, হুতিরা সাম্প্রতিক সময়ে যে এলাকাগুলো দখল করেছে, সেগুলো তারা ধরে রাখতে পারবে কি না, নাকি সরকারি বাহিনী পালটা হামলা চালানোর মতো অবস্থান ধরে রাখতে পারবে— তা নির্ধারণে এসব পর্বতমালা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সৌদির তেল রপ্তানিতে নতুন ঝুঁকি
রয়টার্স লিখেছে, সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে লড়াই বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন এক সংকটে পড়েছেন। একদিকে সৌদি মিত্রদের সহায়তা করার জন্য তার ওপর চাপ রয়েছে, অন্যদিকে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে শুরু করা যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করতে চান না তিনি। যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র দুই মাস ধরে হুতিদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। পরে একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প ওই হামলা বন্ধ করে দেন। এরপর থেকে ইয়েমেনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়ায়নি।
লোহিত সাগরের উপকূলে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার ফলে হরমুজ প্রণালির বাইরে দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের বাধা তৈরি হলে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে সৌদি আরব এতদিন এই বিকল্প পথ ব্যবহার করে আসছিল।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাড়িয়েছে। অল্পসংখ্যক তেলবাহী জাহাজ এখন বারবার ওই প্রণালি দিয়ে চলাচল করছে। যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে তেল পরিবহনের জন্য এসব জাহাজ রেকর্ড পরিমাণ ভাড়া নিচ্ছে— কখনো কখনো পরিবহন করা তেলের মূল্যের এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত।
এরপর ভারত মহাসাগরে এসব জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। সেখান থেকে এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে তেল পাঠানো হচ্ছে।
রয়টার্সকে ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব চলতি মাস ও আগামী মাসে মোট ৬ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রি করেছে। এসব তেল হরমুজ প্রণালির ওপারে ওমানের কাছাকাছি এলাকা থেকে জাহাজে তোলা হবে।
স্যাটেলাইট তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি দৈনিক ২৯ লাখ ব্যারেলে উঠেছে। আগস্টে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ৭ লাখ ব্যারেল।
রয়টার্স লিখেছে, সৌদি আরবের এই বাড়তি তেল সরবরাহ বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে না দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। গত সপ্তাহে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলারে উঠে যাওয়ার পর বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ১০০ ডলারের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
তবে পরিশোধিত কিছু জ্বালানির ক্ষেত্রে ভোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো রেকর্ড দামের মুখোমুখি হচ্ছে। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা ডিজেলের দামও নতুন সর্বোচ্চ রেকর্ডে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালিতে সর্বশেষ যে হামলার খবর পাওয়া গেছে, তাতে ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, প্রণালিতে প্রবেশের সময় একটি জাহাজে কোনো একটি বস্তু দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এতে জাহাজটির কয়েকজন ক্রু সামান্য আহত হয়েছেন। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এর আগে একটি গ্যাসবাহী ট্যাংকারেও হামলা হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বৃহত্তর সংঘাত নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও অনেকটা স্থবির হয়ে আছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছিল। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই চুক্তি ভেঙে যায়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মঙ্গলবার নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।