দেশের বাজারে চালের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। আগে অনুমোদিত রপ্তানি কোটার পরিমাণ অর্ধেক করে নতুন বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রপ্তানির ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন এফওবি মূল্য ১.৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণসহ একাধিক শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানের জন্য আগে অনুমোদিত সুগন্ধি চাল রপ্তানির পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ করা হয়। নতুন বরাদ্দ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে এবং আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বহাল থাকবে।
সরকার জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির চাপ নিয়ন্ত্রণ করাই এ সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য সুগন্ধি চাল রপ্তানি অব্যাহত থাকবে, তবে তা নির্ধারিত সীমার মধ্যেই করতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৫ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত ৩০ আগস্ট পর্যন্ত অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র ১২৯টি মোট ২ হাজার ৪১৯ মেট্রিক টন চাল রপ্তানি করেছে।
অর্থাৎ অনুমোদিত কোটার তুলনায় প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ ছিল অনেক কম। নতুন বরাদ্দ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সংশোধিত বরাদ্দ অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন করে নির্ধারিত সীমার বেশি সুগন্ধি চাল রপ্তানি করতে পারবে না। ভবিষ্যতে নতুন রপ্তানি অনুমোদনের জন্য আবেদন করলে আগের অনুমোদিত কোটার বিপরীতে কতটুকু চাল বাস্তবে রপ্তানি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও প্রমাণও দিতে হবে।
রপ্তানির পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়ায় নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি চালান জাহাজীকরণের আগে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চালের মান ও পণ্যের সত্যতা যাচাই করবে। চালান পাঠানোর পর সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখায় জমা দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সুগন্ধি চালের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন এফওবি রপ্তানিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১.৬০ মার্কিন ডলার। ফলে এর চেয়ে কম দামে সুগন্ধি চাল রপ্তানি করা যাবে না। এর মাধ্যমে কম দামে অতিরিক্ত রপ্তানি ঠেকানোর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের স্বার্থও রক্ষা করতে চায় সরকার।
রপ্তানি অনুমোদন অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের সুযোগও রাখা হয়নি। কোনো রপ্তানিকারক তাঁর অনুমোদন অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে দিতে পারবেন না। একইভাবে সাব-কন্ট্রাক্ট বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনুমোদিত চাল রপ্তানির সুযোগও বন্ধ রাখা হয়েছে।
রপ্তানি থেকে অর্জিত অর্থ দেশে ফেরত আনার বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এজন্য রপ্তানি আয়ের প্রত্যাবাসনের প্রমাণ হিসেবে PRC (Proceeds Realization Certificate) জমা দিতে হবে। অর্থাৎ শুধু পণ্য রপ্তানি করলেই হবে না, এর বিপরীতে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফেরত এসেছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রজ্ঞাপনে রপ্তানিকারকদের রপ্তানি নীতি ২০২৪-২৭-এর বিধান যথাযথভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জনস্বার্থে সরকার যেকোনো সময় কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই রপ্তানির অনুমোদন বাতিল করতে পারবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সিদ্ধান্তকে সরাসরি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সরকার নিয়ন্ত্রিত রপ্তানি নীতি অনুসরণ করছে। সুগন্ধি চাল দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে এর সরবরাহ কমে গেলে সরাসরি দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি ও দেশের ভোক্তাদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। এ কারণেই রপ্তানির পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি পণ্যের মূল্য, মান, পরিমাণ, নথিপত্র এবং রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনার বিষয়েও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে রপ্তানিকারকদের আগের তুলনায় কম পরিমাণে চাল রপ্তানি করতে হবে এবং অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে নতুন অনুমোদন পেতে হলে আগের রপ্তানির পূর্ণাঙ্গ হিসাবও উপস্থাপন করতে হবে।
সরকারের অবস্থান হলো, সুগন্ধি চালের রপ্তানি বন্ধ করা হচ্ছে না; তবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ বাজারের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তা করতে হবে। ফলে আগামী মাসগুলোতে চালের সরবরাহ, বাজারদর ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রপ্তানি অনুমোদনের এই কাঠামো আরও কঠোর কিংবা নমনীয় করার সুযোগও থাকছে।