যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি স্থায়ী শান্তিতে পৌঁছানোর লক্ষে ইরানের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত শনিবার ২৩ মে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একটি পোস্টে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অত্যন্ত সংবেদনশীল এই ভূ-রাজনৈতিক অগ্রগতির বিষয়টি প্রকাশ করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, খসড়া চুক্তিটি মূলত প্রস্তুত, তবে এটি এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচক দলসহ মধ্যস্থতাকারী বিভিন্ন রাষ্ট্রের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী পুনরায় সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই বড় ধরনের কূটনৈতিক ঘোষণার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী শীর্ষ নেতার সাথে টেলিফোনে দীর্ঘ আলোচনা সম্পন্ন করেন। হোয়াইট হাউস সূত্রের খবর অনুযায়ী, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, জর্ডান, মিশর, তুরস্ক এবং বাহরাইনের রাষ্ট্রপ্রধান ও নীতিনির্ধারকদের সাথে ফোনালাপে চুক্তির নানা দিক নিয়ে কথা বলেন তিনি। এর পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিাহুর সাথেও তাঁর একটি পৃথক ও অত্যন্ত ফলপ্রসূ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের ওই পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও যোগ করেন, চুক্তির শেষ মুহূর্তের কিছু খুঁটিনাটি ও কারিগরি বিষয় নিয়ে বর্তমানে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার এই যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে পাকিস্তান। ট্রাম্পের এই বার্তার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক বিবৃতিতে জানান, দুই বৈরী দেশের মধ্যকার সংলাপের পথকে আরও সহজ ও কার্যকর করতে ইসলামাবাদ তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। একই সাথে তিনি অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, খুব শিগগিরই পাকিস্তান উভয় পক্ষের মধ্যকার পরবর্তী উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনার আতিথেয়তা করার সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে ফোনালাপের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে এই কূটনৈতিক অগ্রযাত্রায় সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন, যেকোনো ধরনের সফল চুক্তি হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর অবাধ ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করবে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক।
মিশরের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় থেকেও প্রায় একই ধরনের ইতিবাচক বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের উচিত এই বিরল কূটনৈতিক সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে একটি স্থায়ী চুক্তিতে উপনীত হওয়া।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই নমনীয় অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ চলতি সপ্তাহের শুরুতেও তিনি ইরানকে লক্ষ্য করে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতিতে আসার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং তিনি যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোর বিশেষ অনুরোধ ও সনির্বন্ধ আবেদনের প্রেক্ষিতে তিনি সেই আক্রমণাত্মক অবস্থান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে সম্মত হন। কখনো তীব্র সামরিক হুমকি আবার কখনো কূটনৈতিক সাফল্যের আশা জাগিয়ে রাখা ট্রাম্পের এই কৌশলগত আলোচনার পর অবশেষে বিশ্ববাসী একটি বড় ধরনের যুদ্ধাবসান দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।