সোমবার, 21 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

হামাসের হামলার ১০ দিন আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন নেতানিয়াহু

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামাসের নজিরবিহীন হামলার ঠিক ১০ দিন আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা পৌঁছেছিল প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সরাসরি ফোন করে হামাসের তৎকালীন নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারের বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন—নতুন একটি বইয়ে এমনই দাবি করা হয়েছে।

হামাসের হামলার ১০ দিন আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন নেতানিয়াহু

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামাসের নজিরবিহীন হামলার ঠিক ১০ দিন আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা পৌঁছেছিল প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সরাসরি ফোন করে হামাসের তৎকালীন নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারের বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন—নতুন একটি বইয়ে এমনই দাবি করা হয়েছে।

হারেৎজের দুই সাংবাদিকের লেখা ‘হোস্টেজেস: ৮৪৩ ডেজ অব অ্যাবান্ডনমেন্ট’ বইয়ে বলা হয়েছে, আবুধাবির প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নেতানিয়াহুর কাছে ওই ফোনটি যায়। প্রায় ৪৫ মিনিটের কথোপকথনে হামাসের সম্ভাব্য সামরিক অভিযান এবং এর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে বইটির সবচেয়ে আলোচিত দাবি হলো, সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও নেতানিয়াহু বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করেননি।

এর মাত্র ১০ দিন পরই ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামাসের ভয়াবহ হামলা ঘটে।

‘ভূমিকম্প’ অভিযানের প্রস্তুতির দাবি

বইটির লেখকদের তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবরের আগে ইয়াহিয়া সিনওয়ার এক সাবেক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন যে হামাস বড় ধরনের একটি ‘ভয়াবহ অভিযানে’র প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওই অভিযানের সম্ভাব্য প্রভাব বোঝাতে সিনওয়ার ‘ভূমিকম্প’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

সিনওয়ারের এই প্রস্তুতির খবর কীভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে কীভাবে নেতানিয়াহুর কাছে যায়, বইটিতে তারও বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এমনকি নিরাপদ যোগাযোগের জন্য একজন আমিরাতি কূটনীতিক নেতানিয়াহুকে একটি সুরক্ষিত ফোনও দিয়েছিলেন।

অর্থাৎ দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি ও নিরাপদ যোগাযোগের ব্যবস্থা আগে থেকেই ছিল। নতুন বইটির দাবি অনুযায়ী, সেই যোগাযোগের মাধ্যমেই হামাসের সম্ভাব্য বড় অভিযানের সতর্কবার্তা নেতানিয়াহুর কাছে পৌঁছেছিল।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সতর্কবার্তাটি পাওয়ার পর ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা নেতৃত্বকে কি তা জানানো হয়েছিল?

বইটির তথ্য অনুযায়ী, বিন জায়েদের সতর্কবার্তায় নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া ছিল তুলনামূলকভাবে শান্ত। তিনি আমিরাতের প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েলের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাগুলো সেই আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের পার্থক্য তুলে ধরে।

সতর্কবার্তার ১০ দিন পর হামলা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ভোরে হাজার হাজার হামাস যোদ্ধা গাজা সীমান্ত অতিক্রম করে ইসরায়েলে প্রবেশ করে। একই সময়ে সীমান্তবর্তী সামরিক ঘাঁটি ও বিভিন্ন বসতিতে হামলা চালানো হয়। ব্যাপক রকেট হামলায় ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

হামলায় ১২ শতাধিকের বেশি ইসরায়েলি নিহত হন। একই সময়ে হামাস ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায়।

এই হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে সামনে আসে। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শুধু সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা নয়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন জোরালো হয়।

৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলের বিভিন্ন গোয়েন্দা ও সামরিক সংস্থার অভ্যন্তরীণ সতর্কতা, সীমান্তে হামাসের অস্বাভাবিক তৎপরতা এবং হামাসের প্রস্তুতি সম্পর্কে আগাম তথ্য থাকার বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

নতুন বইয়ের দাবি সত্য হলে এসব তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—একটি মিত্র দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সরাসরি সতর্কবার্তা।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ

বইটির তথ্য প্রকাশের পর নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন। বিরোধী দলগুলোর কয়েকজন নেতা যৌথ বিবৃতিতে জানতে চেয়েছেন—৭ অক্টোবরের আগে নেতানিয়াহু আসলে কী জানতেন, কখন জানতেন এবং নাগরিকদের সুরক্ষায় তিনি কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।

সাবেক সামরিক কমান্ডার ও নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট বলেছেন, ৭ অক্টোবরের আগে নেতানিয়াহুর কাছে একাধিক সতর্কবার্তা পৌঁছেছিল এবং তিনি সেগুলো উপেক্ষা করেছেন। তার ভাষায়, নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ‘অযোগ্য’।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ৭ অক্টোবরের প্রাণহানির জন্য নেতানিয়াহু ‘ব্যক্তিগত ও সরাসরি দায়’ বহন করেন। বেনেটের দাবি, নেতানিয়াহুর আর এক মুহূর্তও ক্ষমতায় থাকা উচিত নয়।

মধ্য-বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলানও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন।

বিরোধীদের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রশ্ন—‘কেউ আমাকে জানায়নি’ বা ‘আমি যথাসময়ে জানতাম না’—এই ব্যাখ্যা এখন আর গ্রহণযোগ্য কি না।

নেতানিয়াহুর দাবি

তবে নতুন বইয়ে ওঠা অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন নেতানিয়াহু। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হারেৎজের প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে।

নেতানিয়াহুর দাবি, ওই সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে তার এমন কোনো কথোপকথনই হয়নি।

ফলে ঘটনাটি নিয়ে এখন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বর্ণনা সামনে এসেছে। একদিকে হারেৎজের অনুসন্ধান ও নতুন বইয়ের দাবি, অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সরাসরি অস্বীকার।

এ কারণে মূল প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি—সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সত্যিই কি শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে নেতানিয়াহুর ফোনে কথা হয়েছিল? হয়ে থাকলে, সেই আলোচনায় ঠিক কী বলা হয়েছিল? এবং সতর্কবার্তাটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোর কাছে পৌঁছেছিল কি না?

স্বাধীন তদন্তের দাবিও জোরালো

৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকেই ঘটনাটি নিয়ে ইসরায়েলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে বিরোধী দলগুলো। তাদের মতে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রয়োজন।

বিরোধীদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ওই কমিশনের সদস্যদের সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার কথা।

তবে নেতানিয়াহুর সরকার এখন পর্যন্ত এ ধরনের কমিশন গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

নেতানিয়াহুর সমালোচকদের ধারণা, স্বাধীন তদন্ত হলে শুধু গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতাই নয়, প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের সিদ্ধান্তও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। নতুন বইয়ে প্রকাশিত দাবিটি সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।

নির্বাচনের আগে আরও বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন

এমন সময়ে বইটির দাবি সামনে এসেছে, যখন ইসরায়েলে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। ফলে ৭ অক্টোবরের আগে কী ঘটেছিল, সেই প্রশ্ন এখন শুধু অতীতের ব্যর্থতা পর্যালোচনার বিষয় নয়; এটি সরাসরি নির্বাচনি রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

নেতানিয়াহুর বিরোধীদের বক্তব্য, তিনি যদি সত্যিই আগাম সতর্কতা পেয়ে থাকেন এবং তা যথাযথভাবে কাজে না লাগিয়ে থাকেন, তাহলে সেটিকে কেবল প্রশাসনিক ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাদের মতে, এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা।

অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রমাণহীন বলে দাবি করা হচ্ছে।

তবু নতুন বইয়ের দাবি ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা নিয়ে পুরোনো প্রশ্নটিকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। এতদিন প্রশ্ন ছিল—ইসরায়েল কি হামাসের হামলার বিষয়ে কিছুই জানত না?

এখন প্রশ্ন আরও নির্দিষ্ট: ইসরায়েল কি জানত? নেতানিয়াহু কি জানতেন? জেনে থাকলে তিনি কাকে জানিয়েছিলেন? আর যদি কাউকে না জানিয়ে থাকেন, তাহলে কেন?

এসব প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে নতুন দাবির পর এগুলোর উত্তর দেওয়ার রাজনৈতিক চাপ আবারও নেতানিয়াহুর ওপরই এসে পড়েছে।

শেষ পর্যন্ত স্বাধীন তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে ৭ অক্টোবরের মাত্র কয়েক দিন আগে একটি মিত্র রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে হামাসের বড় সামরিক অভিযানের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন, তাহলে ৭ অক্টোবরের ইতিহাসে ‘গোয়েন্দা ব্যর্থতা’র পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যর্থতার অধ্যায়টিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।