শনিবার, 7 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

ইতালিকে ছাড়া আরেকটি বিশ্বকাপ, কোথায় হারিয়ে গেল চারবারের চ্যাম্পিয়নরা?

একসময় বিশ্ব ফুটবলের রাজমুকুট বারবার শোভা পেয়েছে ইতালির মাথায়। অথচ আজ সেই দলটিই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে না পারার পর প্রশ্ন উঠেছে—চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এই অবস্থা কেন?

ইতালিকে ছাড়া আরেকটি বিশ্বকাপ, কোথায় হারিয়ে গেল চারবারের চ্যাম্পিয়নরা?

একসময় বিশ্ব ফুটবলের রাজমুকুট বারবার শোভা পেয়েছে ইতালির মাথায়। অথচ আজ সেই দলটিই বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে না পারার পর প্রশ্ন উঠেছে—চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এই অবস্থা কেন?

ইতালির ফুটবল পতনকে অনেকেই নানা রূপকে ব্যাখ্যা করছেন। তবে বাস্তবতা হলো, কয়েক বছরের নয়, দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা নানা সমস্যার ফলই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০১৮ বিশ্বকাপে জায়গা হারানোর ধাক্কা প্রথমে অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। কিন্তু সেই ব্যর্থতা যে সাময়িক নয়, তা পরবর্তী বছরগুলোতে আরও পরিষ্কার হয়েছে।

বিশ্বকাপের মঞ্চে ইতালির অনুপস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ধারাবাহিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। একসময় যারা নীল জার্সির প্রেমে মুগ্ধ ছিলেন, তাদের অনেকেই হতাশ হয়ে অন্য দলের সমর্থক হয়ে গেছেন। গত এক যুগে ইতালির বিশ্বকাপ-অনুপস্থিতি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক বেদনাময় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

ফুটবল ইতালির সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। ফ্লোরেন্সে একসময় খেলাটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘কালসিও’, যা পরে গোটা দেশে জনপ্রিয়তা পায়। কিংবদন্তি শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ নিকোলো ম্যাকিয়াভেলিও ফুটবলের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। সেই ঐতিহ্যের দেশ আজ বিশ্বকাপের বাইরে।

সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্লে-অফ ফাইনালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর ইতালির প্রভাবশালী দৈনিক কুরিয়েরে দেল্লা সেরা শিরোনাম করেছিল—‘দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ কার্স’। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের জন্য এমন শিরোনামই বর্তমান বাস্তবতার নির্মম প্রতিফলন।

তবে কেবল ভাগ্য বা ‘অভিশাপ’ দিয়ে এই ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করা কঠিন। ইতালির ক্লাব ফুটবলের সাম্প্রতিক চিত্রও জাতীয় দলের দুরবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ২০০৯-১০ মৌসুমে ইন্টার মিলান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পর আর কোনো ইতালিয়ান ক্লাব ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ছুঁতে পারেনি। এমনকি এবার ইতালির কোনো ক্লাব কোয়ার্টার ফাইনালেও জায়গা করে নিতে পারেনি।

ইউরোপের অন্যান্য শীর্ষ লিগের সঙ্গে তুলনায় ইতালির ফুটবল এখন অনেকটাই পিছিয়ে। অর্থনৈতিক শক্তি, বিপণন, ব্র্যান্ড মূল্য কিংবা প্রতিযোগিতার মান—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তারা ইংল্যান্ড, স্পেন কিংবা জার্মানির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো নতুন তারকা তৈরির ব্যর্থতা। একসময় স্থানীয় প্রতিভায় সমৃদ্ধ ছিল ইতালির ক্লাব ও জাতীয় দল। এখন সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে। বরং লুকা মদরিচ বা কেভিন ডি ব্রুইনের মতো তারকারা ক্যারিয়ারের শেষভাগে এসে ইতালিয়ান ফুটবলে যোগ দিচ্ছেন।

অবকাঠামোগত ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়েছে দেশটি। আধুনিক একাডেমি ব্যবস্থা, তরুণ খেলোয়াড় উন্নয়ন কিংবা প্রশিক্ষণ কাঠামো—অনেক ক্ষেত্রেই ইতালি প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে। নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ বা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও প্রায়ই প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে যাচ্ছে। মিলানের নতুন স্টেডিয়াম প্রকল্প তার অন্যতম উদাহরণ।

কোচিং সংস্কৃতির পরিবর্তনও ইতালির ফুটবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ক্লাব পর্যায়ে তাৎক্ষণিক সাফল্যের চাপ এতটাই বেড়েছে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ কমে গেছে। ফলে কোচরা ঝুঁকি নিয়ে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার বদলে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভর করছেন।

ট্যাকটিক্যাল দিক থেকেও ইতালি সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে দেরি করেছে। একসময় রক্ষণভিত্তিক, কৌশলনির্ভর ফুটবল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল। কিন্তু আধুনিক ফুটবল এখন গতি, প্রেসিং ও শারীরিক সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভরশীল। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হওয়ায় ইতালির ঐতিহ্যগত শক্তিই আজ দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।

এসব কারণ বিশ্লেষণ করে ইতালির বর্তমান সংকটের ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়—চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন একটি দল কীভাবে টানা তিনটি বিশ্বকাপের বাইরে থাকে?

ফুটবলের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। আর সেই কারণেই ইতালির এই পতন শুধু একটি দলের ব্যর্থতা নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় বিস্ময় ও বেদনার গল্প।