দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় অবহেলার কারণেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং সেটিই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়—এমন অভিযোগ তুলে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তার চিকিৎসক দলের সদস্য ডা. এফ এম সিদ্দিকী।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যে অবহেলা করা হয়েছে, তা ছিল ‘উইলফুল নেগলিনেন্স’ বা ইচ্ছাকৃত অবহেলা, যা অমার্জনীয় অপরাধ। এই অবহেলা কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, খালেদা জিয়ার ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিকেল বোর্ডের নথিতে রয়েছে। এ কারণে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটির মাধ্যমে চিকিৎসাজনিত অবহেলার তিনটি নির্দিষ্ট বিষয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য কারা ছিলেন এবং কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে তারা চিকিৎসার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, ভর্তিকালীন সময়ে কোন কোন চিকিৎসক চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ও সেখানে অবহেলার প্রমাণ আছে কি না, এবং বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাকালে আইনজীবীর মাধ্যমে ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ কেন বাস্তবায়ন হয়নি বা কারা এতে বাধা দিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিএসএমএমইউ’র সব নথি আইনগতভাবে জব্দ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড।”
চিকিৎসার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ‘২৭.৪.২০২১ তারিখে কোভিড-১৯ জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আমরা, বর্তমান মেডিকেল বোর্ড, উনার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করি। ভর্তির সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা বিস্ময় ও উদ্বেগের সঙ্গে দেখি যে, ম্যাডাম লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত এবং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাড়পত্রে আর্থ্রাইটিসের জন্য মেথোরেক্সেট নামের একটি ওষুধ নিয়মিত খাওয়ার নির্দেশ দেওয়া ছিল, যা ভর্তি অবস্থায়ও দেওয়া হয়েছে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে ওষুধটি বন্ধ করি।’
তিনি জানান, খালেদা জিয়া রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে ভুগছিলেন এবং রিউমাটোলজিস্টদের পরামর্শেই ওই ওষুধ গ্রহণ করছিলেন। পাশাপাশি তার এমএএফএলডি ফ্যাটি লিভার ডিজিজ ছিল। ডা. সিদ্দিকীর ভাষায়, লিভারের অসুখ নির্ণয় করা কোনো জটিল বিষয় নয় এবং মেথোট্রেক্সেট সেবনের ক্ষেত্রে নিয়মিত লিভার ফাংশন পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক।
তিনি অভিযোগ করেন, লিভার ফাংশন টেস্ট খারাপ আসার পরও সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকরা আল্ট্রাসনোগ্রাম পর্যন্ত করেননি এবং ওষুধটি বন্ধ করেননি। অথচ পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বেডসাইডে পয়েন্ট অব কেয়ার আল্ট্রাসাউন্ড (পিওসিইউএস) করা সহজ ছিল এবং অন্তত মেথোট্রেক্সেট বন্ধ করাই ছিল ন্যূনতম কর্তব্য।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসক দলের প্রধান হিসেবে ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ‘অনেকেই প্রশ্ন করেন ম্যাডামকে কী স্লো-পয়জন করা হয়েছে? আমার উত্তর হচ্ছে—মেথোট্রেক্সেট ওয়াজ দ্য ড্রাগ দ্যাট অ্যাক্সিলারেটেড হার ফ্যাটি লিভার… ইন দ্যাট কনটেক্সট ইট অ্যাক্টেড লাইক স্লো পয়জন অব হার লিভার।’
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, আজ দেশের লক্ষ-কোটি মানুষের মনে একটি গভীর আফসোস রয়ে গেছে—গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের জন্য আজীবন লড়াই করা মানুষটি যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন এবং দেখতে পেতেন, মানুষ নির্ভয়ে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করছে।