শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

চাহিদামতো মিলছে না সার, কুড়িগ্রামে কৃষকদের ক্ষোভ

সরকারের পক্ষ থেকে সারের সংকট নেই বলা হলেও কুড়িগ্রামের মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। আমন ধান ও আগাম শীতকালীন সবজি চাষের জন্য কৃষি অফিস যে পরিমাণ সার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে, তার অর্ধেকও বরাদ্দ না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জেলার কৃষকেরা। সংকটের কারণে কোথাও এক বস্তা সার ভাগ করে নিতে হচ্ছে তিন থেকে পাঁচজন কৃষককে, আবার অনেককে খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে।

চাহিদামতো মিলছে না সার, কুড়িগ্রামে কৃষকদের ক্ষোভ

সরকারের পক্ষ থেকে সারের সংকট নেই বলা হলেও কুড়িগ্রামের মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। আমন ধান ও আগাম শীতকালীন সবজি চাষের জন্য কৃষি অফিস যে পরিমাণ সার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে, তার অর্ধেকও বরাদ্দ না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জেলার কৃষকেরা। সংকটের কারণে কোথাও এক বস্তা সার ভাগ করে নিতে হচ্ছে তিন থেকে পাঁচজন কৃষককে, আবার অনেককে খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে।

সারের ঘাটতি নিয়ে জেলার কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে। এরই মধ্যে কিছুদিন আগে এক ডিলারের গুদামে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। অন্য একটি ঘটনায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও ওঠে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইউনিয়নের পাশাপাশি ওয়ার্ড পর্যায়েও সার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় গত বুধবার থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ে সার বিতরণ শুরু হলেও সংকট কাটেনি। লক্ষ্মীর মোড় গ্রামের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, অনুমোদিত ডিলার মতিয়ার রহমানের কাছে মোট ৪০ বস্তা সার রয়েছে। এর মধ্যে ৩০ বস্তা ডিএপি ও ১০ বস্তা টিএসপি থাকলেও ইউরিয়া ছিল না।

কৃষকদের ভাষ্য, শুরুতে দুজনের জন্য এক বস্তা করে সার দেওয়ার নিয়ম থাকলেও পরে তা কমিয়ে তিনজনের জন্য এক বস্তা করা হয়। প্রায় ৩০০ কৃষক সেখানে উপস্থিত থাকলেও সার পেয়েছেন মাত্র ১০০ থেকে ১২০ জন। বাকিদের অনেকেই কোনো সার না পেয়েই বাড়ি ফিরে যান।

ডাক্তারপাড়ার ৩৫ বছর বয়সী কৃষক রাশেদা বেগম সাত বিঘা জমিতে ধান এবং এক বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি সাত বিঘা জমিতে ধান ও এক বিঘা জমিতে বেগুনের আবাদ করেছি। আমার এক বস্তা ইউরিয়া ও দুই বস্তা ডিএপি সার প্রয়োজন, অথচ আমাকে দেওয়া হয়েছে মাত্র এক বস্তা টিএসপি। আমার স্বামী এর আগেও কয়েকবার ডিলারের কাছে গিয়েছেন, কিন্তু সার পাননি।’

দুই বিঘা জমিতে ধান চাষ করা ৩৮ বছর বয়সী মো. নুরুজ্জামানও একই সমস্যার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমি ডিএপি ও ইউরিয়া সার নিতে এসেছিলাম, কিন্তু তারা আমাকে টিএসপি দিতে চেয়েছে। এই টিএসপি দিয়ে আমি কী করব?’

স্থানীয় আরেক কৃষক মো. নুরুদ্দিন বলেন, ‘আমি ১০ বিঘা জমিতে ধান ও বেগুন চাষ করেছি। আমার জরুরি ভিত্তিতে দুই থেকে তিন বস্তা ইউরিয়া ও ডিএপি দরকার, কিন্তু আমি কিছুই পাইনি।’

সেদিন সার না পাওয়া কৃষকদের পরবর্তী চালান আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। খুচরা বিক্রেতা মতিয়ার রহমানও সার সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আজ আমাকে মাত্র ৪০ বস্তা সার দেওয়া হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে দুই বা তিনজনের মধ্যে এক বস্তা করে ভাগ করে দিতে হয়েছে। প্রায় ২০০ জন কৃষক খালি হাতে ফিরে গেছেন। আমি তাদের বলেছি, কাল নতুন চালান আসবে।’

এরপর ভূরুঙ্গামারীর ক্যাম্প মোড় এলাকায় ইউনিয়ন পর্যায়ের ডিলার মেসার্স জনার্দন চন্দ্র সাহার দোকানে গিয়ে দেখা যায়, একটি বস্তা সার তিন থেকে পাঁচজন কৃষকের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। দোকানে অন্য ধরনের সার থাকলেও ইউরিয়া পাওয়া যায়নি।

বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নের কৃষকদের একাংশের অভিযোগ, ডিলারের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় বা ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এমন ব্যক্তিরাই সার পাচ্ছেন। অন্য কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে খুচরা বিক্রেতা ও ডিলারের প্রতিনিধিরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ডিলার প্রতিনিধি আবুল হাশেম বলেন, ‘গতকাল আমি ২৭২ বস্তা ডিএপি, ১৭৮ বস্তা এমওপি, ৬০ বস্তা ইউরিয়া ও ৯৫ বস্তা টিএসপি পেয়েছি। আজ সেগুলো ৯ জন ওয়ার্ড পর্যায়ের খুচরা বিক্রেতার মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে ইউরিয়া সার আমি আটকে রেখেছিলাম, কারণ সরবরাহ খুবই অপ্রতুল। নতুন চালান আসার পর সেটি বিতরণ করা হবে।’

তার ভাষ্য, ‘এই ইউনিয়নের কৃষকেরা দুধকুমার নদের চরে শত শত বিঘা জমিতে বেগুনের চাষ করেন। শুধুমাত্র এই মৌসুমের জন্য আমাদের অন্তত ২০০-৩০০ বস্তা টিএসপি, ৫০০ বস্তা ডিএপি এবং ১ হাজার ২০০ বস্তা ইউরিয়া সার প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য পরিমাণ সার দেওয়া হচ্ছে।’

চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জেলার ৯টি উপজেলায় ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে। পাশাপাশি ২ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজির আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৫ হেক্টর জমিতে বেগুন এবং প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করা হয়েছে।

কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি হেক্টর আমন ধানের জমিতে ১৯৫ কেজি, বেগুনে ২৬০ কেজি, ফুলকপিতে ২৯০ কেজি এবং বাঁধাকপিতে ২৬০ কেজি ইউরিয়া প্রয়োজন।

এই হিসাব ধরে শুধু আমন ধানের জন্যই জেলায় ২৩ হাজার ৬২৯ টন ইউরিয়া দরকার। এর সঙ্গে ফুলকপি ও বেগুনের জন্য আরও যথাক্রমে ৬৫ ও ৯০ টন যোগ হলে মোট ইউরিয়ার চাহিদা দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৭৮৪ টন। অথচ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৪৮৩ টন।

টিএসপির ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘাটতি রয়েছে। জেলায় এ সারের চাহিদা ৬ হাজার ১৬৪ টন হলেও বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ২ হাজার ১০৪ টন। অন্যদিকে ডিএপির চাহিদা ১০ হাজার ৯০৫ টন হলেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৬৭ টন।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, ডিএপি ব্যবহার করলে টিএসপির প্রয়োজন কমে যায় এবং ইউরিয়ার চাহিদাও প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিতে দেখা গেছে, ইউরিয়ার ঘাটতির কারণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ডিএপি বেশি ব্যবহার করছেন।

এই পরিস্থিতির বাস্তবতা দেখতে ভূরুঙ্গামারীর দুধকুমার নদের তীরের গনাইয়ের কুটি চরে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ বেগুনের খেতে শত শত নারী-পুরুষ কাজ করছেন। সেখানে ১০ থেকে ১২ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পর্যাপ্ত রাসায়নিক সার না পেয়ে তাদের অনেকে জৈব সার ও ম্যাগনেসিয়াম ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ আবার ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে ডিএপি প্রয়োগ করছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, কোন ফসলে কী পরিমাণ সার ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা দিকনির্দেশনাও তারা নিয়মিত পাচ্ছেন না।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমন চাষের সময় জমি এমনিতেই বেশ উর্বর থাকে, তাই অনেক পরিমাণ ইউরিয়া ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়া নিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক জমিতে বাড়তি সারের দরকার পড়ে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় খরিপ-২ এবং রবি মৌসুমে প্রচুর আগাম জাতের বেগুন চাষ হয়। এ কারণে আমরা নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ৬০০ টন সার চেয়ে আবেদন করেছি।’

মাঠপর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকবল খুবই কম, তাই প্রত্যেক কৃষকের কাছে সরাসরি গিয়ে দেখা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।’