একাধিক সামরিক হামলা ও দীর্ঘ সংঘাতের পরও ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য সময়সীমায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, আগে বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এই সময়সীমা প্রায় এক বছর পিছিয়ে দিতে পারে।
ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ থেকে সরাতে গত দুই মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একাধিক হামলা চালায়। তবে সর্বশেষ গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই অভিযানগুলো লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত বছরের মাঝামাঝি এক দফা হামলার পর চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু হয়। এসব হামলায় মূলত প্রচলিত সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করা হলেও ইসরায়েল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাতেও আঘাত হানে।
বিশ্লেষকদের মতে, সময়সীমা অপরিবর্তিত থাকার অর্থ হলো তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কার্যকরভাবে বাধাগ্রস্ত করতে হলে এখনো অবশিষ্ট উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করা প্রয়োজন হতে পারে।
গত ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তি আলোচনার লক্ষ্যে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর সংঘাত কিছুটা থেমে যায়। তবে উত্তেজনা রয়ে গেছে এবং দুই দেশের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক বিভাজন এখনো বিদ্যমান। এর মধ্যেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করেছে, যা বৈশ্বিক তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন প্রভাবিত করে জ্বালানি সংকটকে আরও তীব্র করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, চলমান আলোচনার লক্ষ্য হলো নিশ্চিত করা—ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।
এর আগে জুন মাসের ১২ দিনের সংঘাতের আগেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধারণা করেছিল, ইরান তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে একটি পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে সক্ষম হতে পারে। একটি সূত্র জানায়, গত বছরের জুনে নাতাঞ্জ, ফোর্দো এবং ইস্পাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সে হামলার পর সেই সময়সীমা বাড়িয়ে আনুমানিক নয় মাস থেকে এক বছর করা হয়।
হামলায় তিনটি সক্রিয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। তবে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এখনও প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। ধারণা করা হচ্ছে, এর প্রায় অর্ধেক ইস্পাহান নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টারের ভূগর্ভস্থ টানেলে সংরক্ষিত ছিল। আইএইএ-এর মতে, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম আরও সমৃদ্ধ করা হলে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে, আর অপারেশন এপিক ফিউরি সেই সাফল্যের ওপর দাঁড়িয়ে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে—যা তারা পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই পরিষ্কার করে দিয়েছেন—ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারে না এবং তিনি কখনো বাগাড়ম্বর করেন না।’
রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স পরিচালকের দপ্তর কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক হামলায় পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে প্রধান লক্ষ্য না করায় সময়সীমা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানের সামরিক সক্ষমতা, নেতৃত্ব ও প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তিকে টার্গেট করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের নতুন পারমাণবিক লক্ষ্যবস্তু এখন সহজে ধ্বংসযোগ্য অবস্থায় নেই, এটিও সময়সীমা অপরিবর্তিত থাকার একটি কারণ।
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষক এরিক ব্রিউয়ার বলেন, ‘আমাদের জানা মতে, ইরানের সব পারমাণবিক উপাদান এখনো তাদের কাছেই রয়েছে। সম্ভবত এসব উপাদান গভীর ভূগর্ভস্থ স্থানে রাখা হয়েছে, যেখানে মার্কিন অস্ত্র পৌঁছাতে পারে না।’ তিনি বর্তমানে নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের ভাইস প্রেসিডেন্ট।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করতে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের বিষয়েও আলোচনা করেছে, যার মধ্যে ইস্পাহানের টানেল থেকে ইউরেনিয়াম উদ্ধার করার মতো স্থল অভিযান অন্তর্ভুক্ত।
ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইএইএ-এর মতে, ২০০৩ সালে তেহরান তাদের ওয়ারহেড উন্নয়ন কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ ও ইসরায়েল দাবি করে, কর্মসূচির কিছু অংশ এখনো গোপনে চলছে।
জাতিসংঘের সাবেক পারমাণবিক পরিদর্শক ডেভিড অলব্রাইট বলেন, ইসরায়েলি হামলা ও বিজ্ঞানীদের হত্যাকাণ্ড ইরানের সক্ষমতায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘সবাই একমত—জ্ঞানকে বোমা মেরে ধ্বংস করা যায় না, কিন্তু দক্ষতাকে নিশ্চয়ই ধ্বংস করা সম্ভব।’