তৃণমূলের রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ যাত্রা শেষ পর্যন্ত এসে ঠেকল বঙ্গভবনে। প্রায় চার দশক আগে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া এই রাজনীতিক দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপির প্রার্থী ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বিরোধী জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল তৃণমূলের ভোটের রাজনীতি দিয়ে। এরপর ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির নেতৃত্ব, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং শেষ পর্যন্ত মহাসচিবের দায়িত্ব—রাজনীতির নানা ধাপ পেরিয়ে এবার তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। ঠাকুরগাঁও শহরের স্থানীয় রাজনীতি থেকে শুরু হওয়া ফখরুলের রাজনৈতিক যাত্রা প্রায় চার দশক পর এসে পৌঁছেছে বঙ্গভবনে।
শিক্ষকতা থেকে রাজনীতির মাঠে
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা অবশ্য পৌরসভা নির্বাচন দিয়ে শুরু হয়নি। ছাত্রজীবনেই তিনি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বেও ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
তবে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির পেশাগত জীবন শেষ পর্যন্ত তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে পারেনি। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। এর মাত্র দুই বছর পরই আসে তার প্রথম বড় নির্বাচনী সাফল্য।
পৌর চেয়ারম্যান থেকে বিএনপির রাজনীতিতে
১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচন মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সে সময় কোনো জাতীয় রাজনৈতিক দলের প্রার্থী না হয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তার সরাসরি রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ আরও গভীর হয়। পরবর্তী সময়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।
১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ের সংগঠক হিসেবে ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতেও তার পরিচিতি বাড়তে থাকে।
তবে জাতীয় সংসদে প্রবেশের প্রথম প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন তিনি। নির্বাচনে হারলেও দলীয় কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয়তা কমেনি; বরং সাংগঠনিক রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।
সংসদ ও মন্ত্রিসভায় প্রবেশ
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন।
এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার রাজনৈতিক যাত্রা জাতীয় পর্যায়ের নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে যায়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আবারও পরাজিত হন মির্জা ফখরুল। তবে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় তার অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকে।
কঠিন সময়ে বিএনপির নেতৃত্ব
২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়।
প্রায় পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি।
এরপর বিএনপির জন্য কঠিন এক রাজনৈতিক সময় পার হয়। মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার, আন্দোলন, নির্বাচন ও দলীয় সংকট—বিভিন্ন পরিস্থিতিতে দলের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে সামনে ছিলেন মির্জা ফখরুল। দীর্ঘ সময় মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে দলের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বক্তায় পরিণত হন তিনি।
আবারও ঠাকুরগাঁও, এবার জাতীয় ম্যান্ডেট
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বড় ব্যবধানে তার জয় নিজ এলাকার সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতাকেই সামনে আনে।
এ পর্যায়ে তার রাজনৈতিক পরিচয় আর কেবল বিএনপির মহাসচিবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা থেকে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব—রাজনীতির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর অতিক্রম করে তিনি পৌঁছে যান রাষ্ট্রপতি পদের দ্বারপ্রান্তে।
পৌরসভা থেকে বঙ্গভবন
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক যাত্রার বিশেষ দিক হলো এর দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা কোনো একটি পদে থেমে থাকেনি।
স্থানীয় রাজনীতি থেকে দলীয় রাজনীতি, নির্বাচনে পরাজয় থেকে সংসদে প্রত্যাবর্তন, প্রতিমন্ত্রী থেকে বিএনপির মহাসচিব—প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসতে যাচ্ছেন তিনি।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া তাই শুধু মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্য নয়; বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা একজন নেতার প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক অভিযাত্রারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি।
ঠাকুরগাঁও পৌরসভা ভবন থেকে বঙ্গভবন—এই যাত্রার দূরত্ব শুধু ভৌগোলিক নয়, রাজনৈতিকও। এর মাঝখানে রয়েছে প্রায় চার দশকের নির্বাচন, আন্দোলন, পরাজয়, প্রত্যাবর্তন, দলীয় সংকট ও নেতৃত্বের নানা পরীক্ষা।
একসময় স্থানীয় মানুষের ভোটে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য—যাত্রার শুরু হয়েছিল তৃণমূলের ভোটে, আর গন্তব্য হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ।