বৃহস্পতিবার, 22 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

মৌলভীবাজারের হাওরে পাকা ধান পানিতে ডুবে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গ

টানা কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে মৌলভীবাজার জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল এখন পানিতে থৈ থৈ করছে। হাকালুকি হাওর, কাউয়াদীঘি হাওর, হাইল হাওরসহ ছোট-বড় হাওরগুলোতে হাজারো কৃষকের কষ্টে ফলানো বোরো ধান মাঠেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে পাকা ধান কাটার আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আর কৃষকদের চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে বছরের পরিশ্রম।

মৌলভীবাজারের হাওরে পাকা ধান পানিতে ডুবে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গ

টানা কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে মৌলভীবাজার জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল এখন পানিতে থৈ থৈ করছে। হাকালুকি হাওর, কাউয়াদীঘি হাওর, হাইল হাওরসহ ছোট-বড় হাওরগুলোতে হাজারো কৃষকের কষ্টে ফলানো বোরো ধান মাঠেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে পাকা ধান কাটার আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আর কৃষকদের চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে বছরের পরিশ্রম।

সোমবার (৪ মে) শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের হাইল হাওর, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার গিয়াসনগর ইউনিয়নের বৌলার হাওর, বিন্নার হাওর, মোস্তাপুর ইউনিয়নের খাইঞ্জার হাওর এবং কাউয়াদীঘি হাওর পরিদর্শনে দেখা যায়, পাকা ধান মাঠে থাকতেই পানিতে সম্পূর্ণ ডুবে গেছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, ধার-দেনা করে উন্নত জাতের বোরো ধান চাষ করেছিলেন তারা। ফলনও ভালো হয়েছিল। কেউ কেউ মাত্র দুই কেয়ার জমির ফসল কেটে ৪৫–৫০ মণ ধান ঘরে তুলতে সক্ষম হলেও, রাতের বৃষ্টিতে পুরো ফসল পানিতে তলিয়ে যায়।

কাউয়াদীঘি হাওরপারের একাধিক গ্রামের মেদিনীমহল, নিদনপুর, ধুলিজোড়া, জামুয়া, কেওলাসহ আশপাশ এলাকার কৃষকদের ৮–১০ হাজার একর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। হাওরের উলাউলি, মাটিগোড়া, ফাটাশিঙা বিল এলাকায় চুক্তিবর্গা নিয়ে প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে চাষ করা কৃষক সুজন মিয়া জানান, শ্রমিক সংকটে ধান কাটতে দেরি হওয়ায় এক রাতের বৃষ্টিতেই সব ফসল ডুবে যায়। তিনি বলেন, যদি ২–৩ দিনের মধ্যে পানি নেমে যায়, কিছু ধান উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

একই এলাকার বর্গাচাষী নজরুল ইসলাম জানান, তিনি কাউয়াদীঘি হাওরে ৮০ কিয়ার জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে ১২ কিয়ার ধান কাটা সম্ভব হলেও বাকি ৬৮ কিয়ার জমির ধান সম্পূর্ণ পানির নিচে চলে গেছে। তিনি বলেন, “শক্তি নামক এনজিও থেকে ৬ লাখ টাকা ধার নিয়ে এখন ধান তলিয়ে যাওয়ায় পথে বসার মতো অবস্থা।”

অন্য কৃষক সিরাজ মিয়া জানান, ২০ কিয়ার জমির সব ধান এখন পানির নিচে। তার মতে, “কোনভাবেই আর ফসল ঘরে তোলা সম্ভব নয়।” একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন অসংখ্য কৃষক।

এদিকে কৃষকরা জানান, মনু প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউসের আটটি মেশিন নিয়মিত চালু থাকলে দুই-তিন দিনের মধ্যে পানি কিছুটা কমানো সম্ভব হতো। তবে খাল-বিল ও নালা ভরাট থাকায় এবং বিভিন্ন দিক থেকে পানি প্রবেশ করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে পাম্প হাউসও সবসময় সচল রাখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

শামসুউদ্দিন নামের এক কৃষক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে খাল খনন না করায় অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং হাওরে পানি দ্রুত বাড়ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন ওয়ালিদ জানান, গত কয়েকদিন বিদ্যুৎ সংকট না থাকায় কাশিমপুরের সব পাম্প সচল রয়েছে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি কমছে না। তার মতে, বৃষ্টি থামার পর অন্তত ৪–৫ দিন সময় লাগবে পানি স্বাভাবিক হতে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ৮২.৫ শতাংশ অর্থাৎ ৩০ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। নন-হাওর এলাকায় ৮ হাজার ৬০ হেক্টর জমির ফসল কাটা হয়েছে, যা মোটের ২৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে গড় কাটার হার ৪৯ শতাংশ।

অধিদপ্তর আরও জানায়, বিভিন্ন হাওরে প্রায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টর জমির ফসল প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মোট ৬৯০ হেক্টর জমিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে আনুমানিক ৮ হাজার ৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি—প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে ও শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান, উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য ও সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পর্যবেক্ষণ চলমান রয়েছে।