নোয়াখালীতে স্কুলছাত্রী তাসনিয়া হোসেন অদিতা (১৪) হত্যার ঘটনায় আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেছে আদালত। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তার সাবেক গৃহশিক্ষক আব্দুর রহিম রনি (৩৪)-কে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ খোরশেদুল আলম শিকদার বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে আসামির উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তাকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় আদালত এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বহুল আলোচিত এ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে আদালতপাড়া ও পুরো জেলায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। রায় ঘোষণার পর আসামি রনিকে কারাগারে পাঠানো হয়।
দণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুর রহিম রনি নোয়াখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার খলিল মিয়ার ছেলে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নোয়াখালী পৌরসভার লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার জাহান মঞ্জিল নামের একটি বাসা থেকে অদিতার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার গলা, হাত ও পায়ের রগ কাটা অবস্থায় ছিল। ঘটনার পর এলাকায় চরম চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। একই রাতে পুলিশ তার সাবেক গৃহশিক্ষক রনিকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি, বালিশসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন।
তদন্তে উঠে আসে, কিছুদিন আগে অদিতা রনির কাছে পড়া বন্ধ করে অন্য কোচিংয়ে ভর্তি হলে তিনি ক্ষুব্ধ হন। ঘটনার দিন অদিতার মা বাসায় না থাকায় সুযোগ নিয়ে রনি বাসায় প্রবেশ করেন এবং অদিতাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হয়ে ঘটনা আড়াল করতে তিনি তাকে হত্যা করেন এবং ঘটনাকে ডাকাতি হিসেবে উপস্থাপন করতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে পালিয়ে যান।
নিহত অদিতা নোয়াখালী পৌরসভার লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার মৃত রিয়াজ হোসেনের মেয়ে। তার মা রাজিয়া সুলতানা স্থানীয় একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।
রায় ঘোষণার পর পরিবারের পক্ষ থেকে সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানানো হয়। তবে আসামিপক্ষ এ রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে।
অদিতার মা রাজিয়া সুলতানা বলেন, আমার মেয়েকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ছিলাম। আদালতের এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। এখন দ্রুত রায় কার্যকর করা হোক, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো মা এভাবে সন্তান হারানোর কষ্ট না পান।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন বলেন, আমরা আদালতের এ রায়ে সন্তুষ্ট নই। মামলার বিভিন্ন দিক ও উপস্থাপিত তথ্য পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। আমরা আশা করি, উচ্চ আদালতে আমাদের বক্তব্য যথাযথভাবে বিবেচিত হবে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মোল্লা হাবিবুর রসুল মামুন বলেন, দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণ শেষে আদালত ন্যায়সঙ্গত রায় দিয়েছেন। আমরা শুরু থেকেই বিশ্বাস করতাম, সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। এ রায়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পেয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. সেলিম শাহী জানান, মামলায় বাদীপক্ষের ৪১ জন এবং আসামিপক্ষের পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে রায় ঘোষণা করা হয়। আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে আসামিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেন।