সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর প্রত্যাহার করা হয়েছিল ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসানকে। এবার রাষ্ট্রদ্রোহের একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে আদালতে হাজির করা হলে মামলার তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বিচারক।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাতে রাকিবুল হাসানকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. দিদারুল আলমের আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের ক্যান্টনমেন্ট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার নাজমুল হক জানান, ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় বৃহস্পতিবার বিকেলে রাকিবুলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তাঁকে আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন করা হলে বিচারক পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী ও উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে।
এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি থাকা অবস্থায় রাকিবুল হাসানের কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শোনা যায় তাঁকে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা, পুলিশের সক্ষমতা এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও কথা বলেন তিনি। পুলিশের বিভিন্ন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগও করেন।
অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরদিন রাকিবুলকে ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। ‘প্রশাসনিক কারণ’ দেখিয়ে তাঁকে রাজারবাগে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ডিএমপি।
১৭ সেপ্টেম্বর রাতে রাকিবুল হাসানকে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। তবে পরদিন ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। এরপর গত এক সপ্তাহ রাকিবুল কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা–ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, রাকিবুলকে প্রত্যাহারের পর তাঁর বিরুদ্ধে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গতকাল বুধবার ডিএমপি কমিশনারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর আজ তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অডিওতে কী বলেছিলেন রাকিবুল
ছড়িয়ে পড়া অডিওতে পুলিশ পরিদর্শক রাকিবুল হাসানকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গে বলতে শোনা যায়, ‘জানি যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না আসলে, কিচ্ছু হবে না। আপনারা তো চিন্তা করতে পারছেন, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল। ভয়ানক দুর্বল। আসা উচিত। ডিসেম্বর দেরি হয়ে গেছে। এই মাসে আসা উচিত ছিল। চলে আসলি এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘সিনিয়র অফিসার সব বিএনপি করতেছে। আমরা তো বিএনপি করতেছি না। সব সিনিয়ররা বিএনপি করতেছে, আমরা বিএনপি করতেছি না। এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই। তোমরা খাবাদাবা,…নিয়ে থাকবা আর আমরা এখানে বসে বসে কাজ করব, তা তো হবে না।’
পুলিশে ওসি পদে পদায়নে অর্থ লেনদেন এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে অযোগ্যদের পদায়নের অভিযোগও করেন রাকিবুল। মনির নামে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার গাড়িচালক থানার ওসি পদায়ন করছেন বলেও অডিওতে দাবি করা হয়।
তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘এগুলো সহ্য করা যায়? আর কী বলব? যারা পোস্টিং পাইতেছে, তার (মনির) কাছে টাকা দিচ্ছে, সকালবেলা পোস্টিং হইতেছে।’
মামলায় যা বলা হয়েছে
ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী ও উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি পুলিশ পরিদর্শক মো. রাকিবুল হাসানকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ঘটনার পেছনের মূল ষড়যন্ত্র উন্মোচনে তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।