ভারতীয় সংগীত জগতের কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলে আর নেই। রোববার (১২ এপ্রিল) সকালে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। গত শনিবার সন্ধ্যায় বুকে ব্যাথা ও প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে জরুরি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে তাঁর মৃত্যু হয়।
সংগীত ছিল আশা ভোঁসলের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বলতেন, গান গাওয়া তাঁর কাছে শ্বাস নেওয়ার মতো। ৯০ বছর বয়সেও মঞ্চে টানা তিন ঘণ্টা গান গেয়ে দর্শকদের মাতিয়ে রাখার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। ক্যারিয়ারে ১২ হাজারের বেশি গানে কণ্ঠ দেওয়া এই শিল্পী সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য দাদাসাহেব ফালকে ও পদ্মভূষণের মতো সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। এমনকি বিশ্বমঞ্চে ১৯৯৭ সালে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন তিনি।
পেশাগত জীবনে আকাশচুম্বী সাফল্য পেলেও আশা ভোঁসলের ব্যক্তিগত জীবন ছিল অসংখ্য চড়াই-উতরাই ও বিষাদে ঘেরা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে গণপতরাও ভোসলেকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি; বরং শ্বশুরবাড়িতে নানা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। একবার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে গর্ভবতী অবস্থায় আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তিন সন্তানকে নিয়ে একাই জীবন সংগ্রাম শুরু করেন এবং ১৯৬০ সালে প্রথম স্বামীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে।
এরপর আশার জীবনে বসন্ত হয়ে এসেছিলেন প্রখ্যাত সুরকার রাহুল দেব বর্মন (আর ডি বর্মন)। ১৯৮০ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই জুটি ভারতীয় ও বাংলা সংগীত জগতকে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য কালজয়ী গান। ১৯৯৪ সালে রাহুলের মৃত্যুর পর আশা পুনরায় একা হয়ে পড়েন। জীবনের শেষ ভাগে এসে তিনি তাঁর দুই সন্তান—কন্যা বর্ষা ও পুত্র হেমন্তের অকাল মৃত্যু দেখেন। ২০২২ সালে বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণেও তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।
সংগীতের পাশাপাশি রান্নার প্রতি দারুণ অনুরাগী ছিলেন এই শিল্পী। নিজের সেই শখ থেকে ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক মানের রেস্তোরাঁ ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি, যা বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পায়। আগামী সেপ্টেম্বরে তাঁর ৯৩ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে সুরের মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন এই মহাতারকা। তাঁর প্রয়াণে সংগীত বিশ্বে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তবে তাঁর অমর কণ্ঠ ও সুরের মূর্ছনা চিরকাল সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে রয়ে যাবে।