শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

‘এক-আইডি’ চালুর উদ্যোগ সরকারের, মিলবে স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ সব সেবা

দেশের সব নাগরিকের জন্য একক পরিচয়পত্র চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জন্মের পরই এই পরিচয়পত্র দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা ‘এক-আইডি’ নামের এই পরিচয়পত্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

‘এক-আইডি’ চালুর উদ্যোগ সরকারের, মিলবে স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ সব সেবা

দেশের সব নাগরিকের জন্য একক পরিচয়পত্র চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জন্মের পরই এই পরিচয়পত্র দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা ‘এক-আইডি’ নামের এই পরিচয়পত্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।


এ জন্য স্থায়ী ও স্বতন্ত্র পরিচয়পত্র তৈরিতে নতুন একটি প্রকল্প নিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ। ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ বা ডি-স্টার নামের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।


বর্তমানে দেশে শিশুর জন্মের পর জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হয়। ১৮ বছর বয়স হলে দেওয়া হয় জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি। সরকারের নতুন পরিকল্পনায় বয়সের এই সীমা থাকবে না। দেশের সব নাগরিককে ‘এক-আইডি’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই পরিচয়পত্র চালু হলে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে নাগরিককে একই তথ্য বারবার দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।


তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, নতুন একক পরিচয়পত্র চালু হলে পর্যায়ক্রমে বিদ্যমান অন্যান্য কার্ডের কার্যকারিতা থাকবে না। এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কার্ডের মাধ্যমে যে সেবা দেওয়া হয়, সেগুলো নতুন পরিচয়পত্রের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো সব সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।


বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, দেশে বর্তমানে নানা ধরনের কার্ড থাকলেও এসব ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। একই ব্যক্তির দুটি জন্মনিবন্ধন কার্ড বা দুটি পাসপোর্ট থাকার ঘটনাও রয়েছে। নতুন পরিচয়পত্র হবে একক ও স্থায়ী। জন্মের পর একটি শিশুকেও এই কার্ড দেওয়া হবে। ফলে আলাদা করে অন্য কোনো কার্ডের প্রয়োজন হবে না।


কার্ডপ্রতি ব্যয় ৩৬৯ টাকা


একক পরিচয়পত্র তৈরির পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়া ও ভারতের মতো বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।


তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ নতুন এই পরিচয় ব্যবস্থার ধারণাকে বলেছেন ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’। অর্থাৎ প্রত্যেক নাগরিকের জন্য থাকবে একটি কার্ড। এটি নাগরিকের ডিজিটাল পরিচয় হিসেবে কাজ করবে এবং এর মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনও করা যাবে। তবে কার্ডটিতে কী কী তথ্য রাখা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।


নতুন প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারির হিসাব ধরে দেশের ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য পরিচয়পত্র তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণ করা হবে ২০ কোটি। প্রতিটি ‘পলিকার্বোনেট চিপ’ কার্ড তৈরি ও মুদ্রণের খরচ ধরা হয়েছে দুই ডলার। বর্তমান বিনিময়মূল্যে এর পরিমাণ ২৪৬ টাকা।


এ ছাড়া একটি কার্ড বিতরণ ও সরবরাহে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ ডলার বা ১২৩ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদন, মুদ্রণ, বিতরণ ও সরবরাহ—সব মিলিয়ে প্রতিটি কার্ডের পেছনে ব্যয় হবে ৩৬৯ টাকা।


পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে নেওয়া হবে। প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত হবে কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণ, বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) তথ্য সংগ্রহ এবং কার্ড বিতরণ। এসব কাজে মোট ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।


বিদ্যমান তথ্যভান্ডার নিয়েও প্রশ্ন


দেশে বর্তমানে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনসহ বিভিন্ন পরিচয়পত্র ও নম্বর চালু রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ব্যবস্থার তথ্যভান্ডারের মধ্যে কার্যকর আন্তসংযোগ গড়ে তোলা সম্ভব হলে নাগরিকের কাছ থেকে একই তথ্য বারবার নেওয়ার প্রয়োজন কমবে। এতে সরকারি সেবা নিতে নাগরিকের ভোগান্তিও কমতে পারে।


বিএনপি সরকার ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, প্রবাসী কার্ড ও কৃষক কার্ড দেওয়ার কথা বলেছে। ফ্যামিলি কার্ড তৈরি ও তথ্য সংগ্রহে ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। কৃষক কার্ডের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮১ কোটি টাকা। তবে প্রবাসী কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ডের পেছনে কত টাকা খরচ হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।


অর্থসংকটের মধ্যে প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন


সরকারের বর্তমান অর্থসংকটের সময়ে ‘এক-আইডি’ প্রকল্প নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। তাদের বক্তব্য, বিভিন্ন খাতে সরকারের বিপুল ব্যয়ের চাপ রয়েছে, অথচ রাজস্ব আদায় কম। অন্যদিকে কারও কারও মত, প্রকল্পটি পাঁচ বছর ধরে বাস্তবায়ন করা হবে। এ সময়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে এবং বর্তমানের মতো অর্থসংকট নাও থাকতে পারে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রকে চাইলে একক পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। ১৮ বছরের কম বয়সীদেরও এর আওতায় আনা যায়। নতুন করে প্রকল্প নেওয়ার আগে এ বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।