মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় আবারও সামনে এসেছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার নাজুক বাস্তবতা। সীমিত মজুত এবং আমদানিনির্ভর ব্যবস্থার কারণে যে কোনো বৈশ্বিক সংকটেই দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে—যেমনটি দেখা গিয়েছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জ্বালানি অবকাঠামোর একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো শোধন ক্ষমতা। গত ৬৩ বছর ধরে তেল শোধনাগারের সক্ষমতায় তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে।
মার্চ মাসের শুরুতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের জ্বালানি মজুত সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে ডিজেল—যা মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৫ শতাংশ—তার মজুত তখন ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার কাছাকাছি নেমে গিয়েছিল।
বিপিসির তথ্য বলছে, দেশে মোট ২৭টি জ্বালানি ডিপো রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি নদীভিত্তিক, ৯টি রেলভিত্তিক এবং ২টি বার্জ ডিপো। এসব স্থাপনায় সর্বোচ্চ ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন ডিজেল, ৫৩ হাজার ৬১৬ টন পেট্রোল এবং ৩৭ হাজার ১৩ টন অকটেন সংরক্ষণ করা সম্ভব।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিছু চালান আসতে বিলম্ব হলেও জ্বালানি সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক রয়েছে। বিপিসির মার্চ মাসের আমদানি পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশে ২ লাখ টন অপরিশোধিত তেল, ৩ লাখ ৭৪ হাজার টন ডিজেল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৪৫ হাজার টন জেট ফুয়েল আসার কথা রয়েছে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে দেশে যে মজুত রয়েছে তা মূলত ‘অপারেশনাল বাফার’ হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ কোনো কারণে আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহের মতো সময় পর্যন্ত নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে।
কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন তেল শোধনাগারের সঙ্গে চুক্তির কারণে জুন মাস পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে। যদিও কিছু চালান নির্ধারিত সময়ের তুলনায় দেরিতে পৌঁছেছে, তবুও সরবরাহ বন্ধ হয়নি। একই সঙ্গে সমতা বজায় রাখতে প্রতিটি যানবাহনের জন্য নির্ধারিত দৈনিক জ্বালানি সীমা (ক্যাপ) মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু করেছে এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
গতকাল ঢাকায় ১৩টি ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে দিনের বেলায় ছয়টিতে কোনো জ্বালানি পাওয়া যায়নি। তবে তেলের ট্রাক পৌঁছানোর পর সন্ধ্যার দিকে তিনটি স্টেশনে আবার বিক্রি শুরু হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসনগুলোকে দেশের সব ফিলিং স্টেশন পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, কিছু পেট্রোল পাম্প সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি করছে, মুনাফার উদ্দেশ্যে মজুত করছে বা খোলা বাজারে সরিয়ে দিচ্ছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক জায়গায় গ্রাহক ও ফিলিং স্টেশন কর্মীদের মধ্যে বিবাদ এবং অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ফিলিং স্টেশন এলাকায় বাড়তি পুলিশ টহলের অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বিপিসি।
কর্মকর্তারা জানান, গত সপ্তাহের শেষ দিকে যে সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছিল তা মূলত হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে। তবে গতকাল থেকে ডিপোগুলো থেকে আবার জ্বালানি সরবরাহ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ‘কৌশলগত জ্বালানি মজুত’ ব্যবস্থা নেই। এমনকি সীমিত পরিমাণ জরুরি মজুত থাকলেও বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা অনেকটা বাড়তে পারতো।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বাজারের অস্থিরতা এড়াতে অতিরিক্ত ১৫ দিনের ব্যবহারের সমপরিমাণ জ্বালানি মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, গত এক দশকে জ্বালানি অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হলেও বাংলাদেশ এখনো সীমিত শোধন ক্ষমতা এবং খুব অল্প মজুত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে চলছে।
১৯৬৩ সালে নির্মিত দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’ বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। অথচ বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টন বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করে।