বহুল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন দেশের নাগরিকরা। উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত হবে নতুন সংসদ। তবে নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন।
জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের বহু নেতা দেশত্যাগ করেছেন কিংবা আত্মগোপনে রয়েছেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করে নিরুদ্দেশ রয়েছেন। অপরদিকে ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু বর্তমানে কারাগারে। ফলে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী শপথ পড়ানোর দায়িত্ব কার ওপর পড়বে—তা নিয়ে দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা।
সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের পর বিদায়ী সংসদের স্পিকার নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পড়াবেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে এ দায়িত্ব পালন করবেন ডেপুটি স্পিকার অথবা স্পিকারের মনোনীত ব্যক্তি। এসব বিকল্পও সম্ভব না হলে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি কিংবা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) শপথ পড়াতে পারেন। প্রয়োজনে কারাগারে থাকা ডেপুটি স্পিকারকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে শপথ পড়ানোর সুযোগও সংবিধানে রাখা আছে। একইভাবে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনও বিদায়ী স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা; তাঁর অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার অথবা রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি অধিবেশন পরিচালনা করবেন।
এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) শপথ প্রশ্নে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াতে পারেন।
একই দিন আইন মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, নতুন নির্বাচিত এমপিদের শপথ পড়ানোর ক্ষেত্রে সাবেক স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের কোনো সুযোগ নেই। কারণ তাঁদের একজন পলাতক এবং অন্যজন কারাগারে রয়েছেন; পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে মামলা চলমান।
আইন উপদেষ্টা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে এমপিদের শপথ পড়ানোর জন্য দুটি পথ খোলা আছে। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি শপথ পড়াতে পারেন। আর যদি তিন দিনের মধ্যে তা সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হবে।
রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি কে হতে পারেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ড. আসিফ নজরুল বলেন, প্রধান বিচারপতিও হতে পারেন। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং শিগগিরই বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধানের ১৪৮(১) অনুচ্ছেদের ২(ক) দফা অনুসরণ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে শপথ পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া গেলেও, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির মতামত নিয়ে আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করতে হবে। তারা মনে করেন, সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতেই এ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, ফলে অযথা বিতর্কের সুযোগ নেই।
বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, বিদায়ী সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতি কিংবা অপারগতার ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনারই নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন। তবে এ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির আদেশ প্রয়োজন হবে। সংসদ সচিবালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পুরো বিষয়টি সম্পন্ন করবে।