নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় শুরু হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এই অধিবেশনে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন’ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের নিষ্পত্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসছে।
সংসদের প্রথম দিনেই আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে জারি হওয়া সব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করবেন বলে জানা গেছে।
অধিবেশন ঘিরে রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে বুধবার সরকার ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা আলাদা করে সংসদীয় দলের বৈঠক করেছেন। তবে এখনো স্পষ্ট হয়নি, প্রথম বৈঠকে কে সভাপতিত্ব করবেন এবং নতুন সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কারা হবেন। বৈঠকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দলের অবস্থান অনুযায়ী নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) রেখে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির অবস্থান হলো— গণভোটে পাস হওয়া জুলাই সনদ হুবহু বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কাঠামো, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত রীতিতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই এই দুটি পদে নির্বাচিত হন। তবে এবার ডেপুটি স্পিকারের পদটি বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর কাছে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বিএনপি।
এই বিষয়ে জুলাই সনদেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য ছিল। তবে বিরোধীদলীয় বৈঠক শেষে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন,
“জুলাই সনদেই আছে একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন। আমরা খণ্ডিতভাবে এটা চাচ্ছি না, আমরা চাই প্যাকেজ, আমরা চাই পিস মিল; পুরোটাই সেখানে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হোক এবং এর ভিত্তিতে আমরা যেন আমাদের ন্যায্য দায়িত্ব পালন করতে পারি।”
নির্বাচন ও নতুন সংসদের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় দেড় বছর পরে ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি। এর আগে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি দ্বাদশ সংসদ ভেঙে দেন।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন ডাকতে হয়। সে অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ১২ মার্চ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন। আজ সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনে শুরু হবে এই অধিবেশন। কতদিন চলবে তা এখনও নির্ধারিত হয়নি; কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে সময়সূচি ঠিক হবে।
স্পিকারের পদ শূন্য
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর এবারই প্রথম স্পিকারের পদ শূন্য রেখে সংসদের অধিবেশন শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা। এবার এমপিদের শপথ পড়িয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসিরউদ্দিন।
অধিবেশনের শুরুতে সংসদ নেতা তারেক রহমান স্বাগত বক্তব্য দেবেন। এরপর তিনি একজন সংসদ সদস্যকে সাময়িকভাবে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করার আহ্বান জানাবেন এবং তাঁর সভাপতিত্বেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সংসদ নেতা তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়েই বিধি অনুযায়ী সভাপতিত্বকারী সদস্যকে আহ্বান জানাবেন।
প্রথম দিনের সম্ভাব্য কার্যসূচি
প্রথম দিনের বৈঠক সাধারণত সংক্ষিপ্ত হয়। নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে এবং এরপর অধিবেশন কিছু সময়ের জন্য মুলতবি হতে পারে।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা হবে। এরপর সংসদ নেতা কোনো একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যের নাম সভাপতিত্বের জন্য প্রস্তাব করবেন এবং অন্য একজন সদস্য তা সমর্থন করবেন।
তিনি আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কটের সিদ্ধান্ত
নতুন সংসদ ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধীদলীয় সদস্যরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভাষণের সময় তারা সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে লবিতে অবস্থান করবেন।
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন,
“সংসদের বৈঠকে আমাদের ভূমিকা দৃশ্যমান হবে। যেমন সূর্য উঠবে, তেমন ভাষণ শুনবেন এবং আমাদের ভূমিকাও দেখবেন।”
এদিকে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে স্বৈরাচারের দোসর আখ্যা দিয়ে বলেন,
“রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। তিনি স্বৈরাচারের দোসর। বিএনপি কেন যে তাঁকে দিয়ে ভাষণ দেওয়াচ্ছে, এটা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।”
আওয়ামী লীগ ছাড়া সংসদ
ছাত্র–জনতার আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে দলটি ত্রয়োদশ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। নবম থেকে দ্বাদশ সংসদের সরকারি দল আওয়ামী লীগ ছাড়াই শুরু হচ্ছে এবারের সংসদ অধিবেশন।
দুটি আসনের ফল স্থগিত
৩০০ আসনের মধ্যে দুটি আসনের ফল এখনো ঝুলে আছে। আদালতের সিদ্ধান্তে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) ও চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর ও মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর ফল স্থগিত রয়েছে। ফলে তারা প্রথম অধিবেশনে যোগ দিতে পারছেন না।
বাকি ২৯৭ আসনের নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। বিএনপির মিত্র গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি একটি করে আসন পেয়েছে।
বিরোধী দলে বসছে জামায়াতে ইসলামী, যারা পেয়েছে ৬৮টি আসন। তাদের সঙ্গে জোট করে এনসিপি পেয়েছে ৬টি আসন। এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, খেলাফত মজলিস ১টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়ী হয়েছেন।