মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রত্যক্ষ সংঘাত এক অভূতপূর্ব ও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দক্ষিণ ইরানি অঞ্চলে মার্কিন বিমান বাহিনীর উপর্যুপরি ও ব্যাপক বোমাবর্ষণের প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে তেহরান এবার জর্ডান, বাহরাইন এবং কাতারে অবস্থিত একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এই সামরিক পদক্ষেপের কারণে প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো এবং মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে। একই সাথে চলমান এই উত্তেজনার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও।
যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তাদের অভিযানের ফলে ইরানের সামরিক শক্তি ও সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি এবং বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জর্ডান, বাহরাইন এবং কাতারের অভ্যন্তরে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানি ড্রোন ও মিসাইল হামলায় বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর (ফিফথ ফ্লিট) সদর দপ্তর এবং কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ মিলেছে। সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পাল্টা হামলা এটিই প্রমাণ করে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টানা বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরান এখনও মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অঞ্চলজুড়ে সুনির্দিষ্ট আঘাত হানার সামর্থ্য রাখে এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালিকে অবরুদ্ধ করার ক্ষমতা তাদের অক্ষুণ্ন রয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে এই বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঠিক আগেই, টানা ষষ্ঠ রাতের মতো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের একাধিক শহর এবং পাঁচটি সংযোগ সেতুতে বিধ্বংসী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। বন্দর আব্বাস, বন্দর খামির, কেশম দ্বীপ ও সিরিকসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চালানো ওই অভিযানে অন্তত আটজন নিহত এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ আহত হন।
নিজেদের ভূখণ্ডে এই হামলার জবাব দিতে ইরানও খুব বেশি সময় নেয়নি। মার্কিন হামলার পরপরই কুয়েত এবং সিরিয়ার আল-তানফ অঞ্চলে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিশেষ অভিযান বাহিনীর (স্পেশাল অপারেশনস) কমান্ড সেন্টার ও মূল রসদ সরবরাহ কেন্দ্রগুলোতে আকস্মিক আক্রমণ চালায় ইরানি বাহিনী। তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই সুনির্দিষ্ট হামলায় মার্কিন বাহিনীর রাডার ব্যবস্থা ও সামরিক হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে এবং সেখানে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতের অভ্যন্তরে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে চালানো ইরানের এই ধারাবাহিক হামলার পর কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। পৃথক পৃথক বিবৃতিতে আরব দেশগুলো এই সামরিক পদক্ষেপকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। এর পাশাপাশি মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগও (এমডব্লিউএল) এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আক্রান্ত রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি সম্পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে। অন্য দিকে, আক্রান্ত দেশগুলোর সরকারি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে তাদের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধেয়ে আসা অধিকাংশ ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে এবং যেকোনো ধরনের বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।