বুধবার, 21 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ভাইরাল ভিডিওর নেশায় মহাসড়কে ‘মরণখেলা’, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় মহাসড়ক যেন পরিণত হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ খেলাঘরে। বেপরোয়া গতিতে বাস চালানো ও বিপজ্জনক কসরতের ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা এখন সড়ক নিরাপত্তার জন্য নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছে।

ভাইরাল ভিডিওর নেশায় মহাসড়কে ‘মরণখেলা’, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় মহাসড়ক যেন পরিণত হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ খেলাঘরে। বেপরোয়া গতিতে বাস চালানো ও বিপজ্জনক কসরতের ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা এখন সড়ক নিরাপত্তার জন্য নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি ‘চাঁদনী পরিবহন’ নামের একটি বাসের ভিডিও ঘিরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, ব্যস্ত মহাসড়কে অন্য যানবাহনকে উপেক্ষা করে হঠাৎ ঝুঁকিপূর্ণভাবে ‘বাউলি’ কাটছে বাসটি। একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডিভাইডারে ধাক্কা লাগে, তবে অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। ঘটনাটি ঘটে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার নাবিল হোটেল এলাকায়, যেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া কিছু তরুণের ক্যামেরায় পুরো দৃশ্যটি ধারণ করা হয়।

পরে আরও একটি ভিডিও সামনে আসলে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পায়। সেখানে দেখা যায়, চালকের পাশেই ইঞ্জিন কাভারে বসে কয়েকজন কিশোর এই বিপজ্জনক চালনার ভিডিও ধারণ করছে। তাদের মধ্যে কোনো ভয় বা উদ্বেগের চিহ্ন নেই; বরং ভাইরাল হওয়ার অদম্য আগ্রহই স্পষ্ট।

সাজানো ঝুঁকি ও ‘বাস লাভার’ সংস্কৃতি

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহাসড়কের পাশে থাকা ভিডিওগ্রাহক এবং বাসের ভেতরের কিশোরদের মধ্যে পূর্বপরিকল্পিত যোগাযোগ ছিল। কিছু ‘লাইক’ ও ‘শেয়ার’ পাওয়ার আশায় চালককে উসকে দিয়ে তৈরি করা হয় এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি। এতে সাধারণ যাত্রী ও পথচারীদের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে।

এ ধরনের ভিডিও এখন সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। নিজেদের ‘বাস লাভার’ পরিচয়ে কিছু তরুণ চালকদের অতিরিক্ত গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ চালনায় উৎসাহিত করছে। কয়েক বছর আগে বিষয়টি আলোচনায় এলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাবে এখন এটি আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে।

টিকটক ও ফেসবুককেন্দ্রিক বিভিন্ন গ্রুপে পরিকল্পিতভাবে এমন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। ‘রেস’ বা প্রতিযোগিতার নামে উসকানিমূলক বার্তা দিয়ে চালকদের আগ্রাসী ড্রাইভিংয়ে প্ররোচিত করা হয়। এমনকি গভীর রাতে হেডলাইট বন্ধ করে গাড়ি চালানোর মতো আত্মঘাতী দৃশ্যও ধারণ করে প্রচার করা হচ্ছে।

একটি গ্রুপের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, “ভিডিওটি আমাদের গ্রুপের ঠিকই, কিন্তু আমরা কোনো অপরাধ বা ভুল করিনি। আমরা চালককে বিপজ্জনকভাবে বাস চালাতে বা বাউলি দিতে সরাসরি বলিনি; চালক নিজেই অতি-উৎসাহী হয়ে এটি করেছেন। বাসে কোনো সাধারণ যাত্রী ছিল না, যারা ছিল সবাই আমাদের গ্রুপের সদস্য ছিল। অহেতুক আমাদের দোষ দেওয়া হচ্ছে।”

তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। শুধু একটি পরিবহন নয়, বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠানের বাস চালকদের মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মহাসড়কে ক্যামেরাধারী তরুণদের দেখলেই চালকদের মধ্যে বাড়তি উত্তেজনা তৈরি হয়, যা ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়।

রিজার্ভ বাসে বেশি ঝুঁকি

তথ্য অনুযায়ী, ভাড়া করা বা রিজার্ভ বাসে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কিছু গ্রুপ যৌথভাবে অর্থ সংগ্রহ করে বাস ভাড়া করে এবং চালককে ইচ্ছেমতো দ্রুতগতিতে চালাতে বাধ্য করে। নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য না থাকলেও মূল উদ্দেশ্য থাকে ভিডিও ধারণ।

অনেক সময় আগেই মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সদস্যদের অবস্থান নিতে বলা হয়, যাতে পুরো ঘটনাটি নিখুঁতভাবে ধারণ করা যায়। ফলে মহাসড়কগুলোতে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

২০২২ সালের ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতি

এই প্রবণতা প্রথম বড় আকারে আলোচনায় আসে ২০২২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। সেদিন কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকায় দুটি বাসের প্রতিযোগিতার সময় একটি বাস ট্রাককে ধাক্কা দিলে ট্রাক উল্টে যায়। এতে চালক ও সহকারী গুরুতর আহত হন। পরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুরো ঘটনাটি আরেকটি বাস থেকে ধারণ করা হচ্ছিল এবং চালকদের বেপরোয়া গতিতে চালাতে উসকানি দেওয়া হচ্ছিল।

উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

সড়ক দুর্ঘটনার চিত্রও ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার হার প্রায় ৯.৫ শতাংশ বেড়েছে। গত পাঁচ বছরে এই হার বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। অন্যদিকে বিআরটিএর তথ্য বলছে, বছরে গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং ১০ হাজারের বেশি আহত বা পঙ্গুত্বের শিকার হন।

বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের সতর্কবার্তা

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “সড়কে সুশৃঙ্খল নজরদারি না থাকায় আমরা মহাসড়কে রেসিং বা ওভারস্পিডিং থামাতে পারছি না। এর মধ্যে নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে, যার একটি বড় উদাহরণ হলো এই ‘বাস লাভার চক্র’। তারা মূলত গণপরিবহনকে ব্যবহার করে বিপজ্জনক রেসিং বা প্রতিযোগিতায় মেতে উঠছে।”

তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু বাসের যাত্রীদের জন্যই নয়, বরং যারা নিয়ম মেনে সড়কে চলেন তাদের জন্যও এক চরম ঝুঁকির কারণ। এই ঝুঁকি এড়াতে প্রশাসনের উচিত কঠোর অভিযান চালানো এবং গণপরিবহন আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। মহাসড়কগুলোকে সার্বক্ষণিক সিসিটিভির আওতায় এনে নিবিড় মনিটরিং করার কোনো বিকল্প নেই।”

হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ এই প্রবণতাকে বিপজ্জনক নেশা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “বাসচালকদের উসকানি দেওয়া কিংবা ভিডিও ভাইরালের বিষয়টি এখন নেশার মতো হয়ে গেছে। হাইওয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে আমাদের ফোর্স সক্রিয় রয়েছে। তবে, এই অপরাধ রোধে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। যাত্রী বা চালক— যে কেউ এমন উসকানিমূলক কাজ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জানাবেন। অভিযোগ পাওয়ামাত্রই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে আমাদের টিমকে নির্দেশনা দেওয়া আছে।”

তিনি আরও বলেন, “তারা হয়তো আনন্দের জন্য এটি করছে, কিন্তু এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। তাই রাস্তায় এমন কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে সঠিক অবস্থান জানান। তথ্য পাওয়া মাত্রই হাইওয়ে পুলিশ দ্রুততম সময়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাময়িক জনপ্রিয়তার মোহে এই উচ্ছৃঙ্খল প্রবণতা যদি এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে সড়কে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।


সুত্র: ঢাকা পোস্ট