রবিবার, 25 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

‘ভাংড়ি মামা’ বুথ: প্লাস্টিক বোতলের বদলে মিলছে সবুজ চারাগাছ

বর্তমান সময়ে পরিবেশের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে প্লাস্টিক দূষণ। বিশেষ করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।

‘ভাংড়ি মামা’ বুথ: প্লাস্টিক বোতলের বদলে মিলছে সবুজ চারাগাছ
ছবি : সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে পরিবেশের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে প্লাস্টিক দূষণ। বিশেষ করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।এমন এক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক অভিনব উদ্যোগ নিয়ে হাজির হয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন মিশন গ্রিন বাংলাদেশ। ‘প্লাস্টিক দিন, গাছ নিন’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে তারা চালু করেছে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর একটি চক্রাকার মডেল, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভাংড়ি মামা’।

উদ্যোক্তাদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে একদিকে প্লাস্টিক দূষণ এবং অন্যদিকে বনভূমি কমে যাওয়ার মতো দ্বিমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শহরাঞ্চলের বর্জ্য নদী-নালা ও আস্তাকুঁড়ে জমে পুরো বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ সাধারণ মানুষের সামান্য সচেতনতাই এই বর্জ্যকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করতে পারে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের অপূর্ব নার্সারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্পের প্রথম স্থায়ী বুথ স্থাপন করা হয়েছে। এই বুথের কার্যপ্রণালী অত্যন্ত সহজ ও আকর্ষণীয়। যেকোনো নাগরিক নিজের ঘরে জমে থাকা কিংবা চারপাশ থেকে কুড়িয়ে নেওয়া ১০টি খালি প্লাস্টিকের বোতল এই বুথে জমা দিলেই তার বিনিময়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে একটি জীবন্ত চারাগাছ পেয়ে যাবেন।

বুথ থেকে সংগৃহীত এই বোতলগুলো যত্রতত্র ফেলে না দিয়ে সরাসরি পুনপ্রক্রিয়াকরণ বা রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের উপযোগী নতুন পণ্যে রূপান্তর করা হবে। এর ফলে একদিকে যেমন দূষণের মাত্রা কমবে, অন্যদিকে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিও গতি পাবে। গাজীপুরের এই স্থায়ী বুথে এখন প্রতিদিন গড়ে শত শত বোতল জমা পড়ছে এবং তার বিপরীতে নাগরিকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির চারাগাছ।

এর আগে তরুণ ও ছাত্রসমাজের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম চালানো হয়েছিল। এখন পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অস্থায়ী বুথ তৈরি করে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতল সংগ্রহ করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে গাছের চারা। ক্যাম্পাসের সেই অভূতপূর্ব সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই এবার সাধারণ মানুষের জন্য গাজীপুরে এই প্রথম স্থায়ী বুথ চালু করা হলো।

মিশন গ্রিন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি এই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে জানান, তাঁরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিরাচরিত চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনতে চান, যেন মানুষ প্লাস্টিককে আবর্জনা না ভেবে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। গাজীপুরের এই বুথটি তাদের দেশব্যাপী বিস্তৃত পরিকল্পনার একটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র। আগামীতে দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও পাড়া-মহল্লায় ‘ভাংড়ি মামা’ বুথের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা, যা পরিবেশ রক্ষায় একেকটি পরিবর্তনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।

এই পরিবেশবান্ধব বিপ্লবকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে দেশের নার্সারি মালিক, করপোরেট স্পন্সর এবং তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। ঢাকা শহরসহ দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যারা এই উদ্যোগে অংশীদার হতে বা বুথ স্পন্সর করতে আগ্রহী, তারা সরাসরি মিশন গ্রিন বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন।

এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের বিষয়ে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, সাধারণ মানুষ যদি তাদের দৈনন্দিন ছোট ছোট অভ্যাসগুলোতে পরিবর্তন আনে, তবে তা পরিবেশ সুরক্ষায় বিশাল অবদান রাখতে পারে। এই মডেলটি একদিকে যেমন প্লাস্টিক মুক্ত পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে বৃক্ষরোপণ বাড়াতেও ভূমিকা রাখবে। সর্বোপরি, দেশের সামগ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ একটি অনন্য মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।