দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও বৈশ্বিক সংকটের চাপের মধ্যে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শনিবার (১৬ মে) দুপুরে চট্টগ্রাম মা ও শিশু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭ তলা একাডেমিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
মন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারগুলো দেশের অর্থনীতিকে ঋণাত্মক অবস্থায় রেখে বিদায় নিয়েছে, যার প্রভাব এখনো বহমান। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটের চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, এই সংকটের ফলে শুধু জ্বালানি খাতেই আগামী অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাত ও বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধে গত দুই মাসে আরও প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতির পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক নয় বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তবে তিনি জানান, চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হবে, যাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পেতে পারে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আগের সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বড় অংশ অনিয়ম ও লুটপাটে অপব্যবহার হয়েছে। বর্তমান সরকার শুধু বরাদ্দ বাড়িয়েই দায়িত্ব শেষ করবে না, বরং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি করবে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে মেডিকেল কলেজগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগ্যতা ছাড়া ভর্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এতে প্রতিষ্ঠানের মান নষ্ট হয়।
অর্থমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সরকার কোনো খাতে অযথা হস্তক্ষেপ করবে না, কারণ এতে পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষার মান নষ্ট হলে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মেডিকেল শিক্ষার মান রক্ষায় আসনসংখ্যা বাড়ানোর আগে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও অবকাঠামো নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, প্রতিটি নাগরিকের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া মৌলিক অধিকার, তবে দীর্ঘদিন মানুষ এ অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।
বর্তমান সরকার ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার’, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার কারণে দরিদ্র রোগীদের জন্য বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে চিকিৎসা ব্যয় সরকার বহন করবে।
আধুনিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ডিজিটাল লাইব্রেরি, খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে হবে। বর্তমান বিশ্ব পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেছে, তাই চিকিৎসা শিক্ষায়ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন, দেশে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ঘাটতি রয়েছে, যার কারণে কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি দক্ষ জনবলের অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এ সমস্যা সমাধানে মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম মা ও শিশু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি সৈয়দ মোরশেদ হোসেনের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আজাদ এবং অধ্যক্ষ অধ্যাপক অসীম বড়ুয়া প্রমুখ।
পরে অর্থমন্ত্রী চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ মহিলা কলেজে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা, নবীন বরণ ও বার্ষিক পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট মফিজুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মো. ফজলুল কাদের চৌধুরী।