যশোরের মনিরামপুরে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বাড়ির নির্মাণাধীন একটি ঘর থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় নেমে এসেছে উত্তেজনা ও নানা প্রশ্ন। স্বজনদের অভিযোগ, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়—বরং পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হতে পারে।
নিহত তাসলিমা খাতুন ময়না (২৩)। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে পৌর শহরের মোহনপুর ওয়াবদা মোড় এলাকায় তার বাবার বাড়ির নির্মাণাধীন একটি ঘর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে মনিরামপুর থানা পুলিশ।
পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, মরদেহের মুখ ও কানে রক্তের দাগ থাকায় তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।
নিহত তাসলিমা মোহনপুর এলাকার মৃত ইব্রাহিম গাজীর মেয়ে এবং মনোহরপুর ইউনিয়নের কুমারঘাটা গ্রামের হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী। প্রায় সাত থেকে আট বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। দম্পতির চার বছর বয়সী একটি পুত্রসন্তান রয়েছে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কলহ চলছিল। এর জেরে তিন থেকে চার দিন আগে ময়না তার বাবার বাড়ি মোহনপুরে চলে আসেন।
ঘটনার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তার স্বামী হেলাল উদ্দিন এবং সৎ বাবা রফিকুল ইসলামকে থানায় নিয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাসলিমার বাবার মৃত্যুর পর তার মা তাহেরা বেগম দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তার বর্তমান স্বামীর নাম রফিকুল ইসলাম। ঘটনার রাতে তিনি বাড়িতেই ছিলেন।
নিহতের বোন মারুফা অভিযোগ করেন, হেলাল উদ্দিন এটি তার তৃতীয় বিয়ে। এর আগে তার আরও দুটি বিয়ে ছিল। তিনি প্রায়ই ময়নাকে নির্যাতন করতেন বলেও দাবি করেন তিনি। মারুফার ভাষ্য অনুযায়ী, চার থেকে পাঁচ দিন আগে হেলাল নিজেই ময়নাকে তার মায়ের বাড়িতে রেখে যান এবং আগামী শুক্রবার তাকে আবার নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তবে তার আগেই এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে মারুফা বলেন, ‘রাতে মা ঘরের ভেতরে ঘুমিয়েছিলেন এবং ময়না বারান্দায় ঘুমায়। ভোরে নামাজ পড়তে উঠে মা দেখেন তার কক্ষের দরজা বাইরে থেকে আটকানো। ময়নাকে অনেক ডাকাডাকির পরও সাড়া না পেয়ে আমার ভাই সাইফুল্লাহকে ডাকা হয়। পরে সে এসে দরজা খুলে দেয়। কিন্তু ময়নাকে কোথাও পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষণ পর মা ময়লা ফেলতে গিয়ে নির্মাণাধীন ঘরের ভেতরে ময়নাকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন।’
তিনি আরও জানান, ঘটনার পর ময়নার মৃত্যুর খবর জানাতে হেলাল উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে অন্য মাধ্যমে খবর দিলে সকাল ৯টার দিকে তিনি ঘটনাস্থলে আসেন।
মারুফার দাবি, হেলাল উদ্দিন সম্প্রতি আরেকটি বিয়ে করেছেন বলে তারা জেনেছেন। সেই স্ত্রীকে ঘরে তোলার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে ময়নাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তার অভিযোগ, রাতে ফোন করে ময়নাকে ঘর থেকে বের করা হয় এবং যাতে বিষয়টি কেউ টের না পান সেজন্য তার মায়ের ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকানো হয়। এরপর নির্মাণাধীন ঘরে নিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হতে পারে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
মনিরামপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বদরুজ্জামান বলেন, ‘তাসলিমার মৃত্যু রহস্যজনক। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।’
মনিরামপুর থানার ওসি আবু সাঈদ জানান, গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনায় তার স্বামী ও সৎ বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।