- জাতীয়
- ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর: কেমন আছেন আন্দোলনের সেই চেনা মুখেরা
-
ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর: কেমন আছেন আন্দোলনের সেই চেনা মুখেরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশকাল: ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৩ এ.এম
রাজধানীর উত্তরার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের সামনে ২০২৪ সালের ২ আগস্ট প্রলয়ংকরী বৃষ্টির মাঝেও প্রকম্পিত হচ্ছিল অধিকার আদায়ের স্লোগান।
সেই বিক্ষোভে উত্তাল জনস্রোতের মাঝে রিকশায় বসে দৃঢ় কণ্ঠে স্লোগান দেওয়া বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শায়লা আক্তার শশীর একটি ছবি সে সময় আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে এসে শায়লা জানান, সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি আজীবন তাঁর মনে দাগ কেটে থাকবে। তবে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে সাধারণ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় তীব্র আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। শায়লার মতে, শহীদদের আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন এখনো নিশ্চিত করা যায়নি এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না এসে কেবল ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে।
শায়লার মতো জুলাই আন্দোলনের এমন আরও বেশ কয়েকজন আলোচিত চরিত্রের জীবনে এখন স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে এসেছে। তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের প্রায় সবার মনেই কাজ করছে এক ধরনের হতাশা। তাঁদের মতে, স্বৈরাচারী সরকারের পতন ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার নিঃসন্দেহে একটি বিশাল প্রাপ্তি, কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সংস্কারের মতো মৌলিক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান নয়। অবশ্য এর বিপরীতে কেউ কেউ মনে করছেন, রাষ্ট্র সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হওয়ায় বর্তমান প্রশাসনকে আরও কিছুটা সময় দেওয়া উচিত।
আন্দোলনের আরেকটি স্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী ছিলেন ধানমন্ডির নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মো. নাহিদুল ইসলাম। ৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে অংশ নিলে সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন মাজার গেটের সামনে পুলিশ তাঁর মুখ চেপে ধরে আটক করে, যা পরবর্তীতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বর্তমানে নাট্য পরিচালনায় যুক্ত থাকা নাহিদুল মনে করেন, পূর্ববর্তী সরকার জাতীয় প্রতীক ও চেতনাকে নিজস্ব গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করায় তাদের পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল। একইভাবে বর্তমান সময়েও জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে কুক্ষিগত করার চেষ্টা চললে তা দেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
একই দিনের কর্মসূচিতে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান। পুলিশের হাত থেকে নিজের এক সহযোদ্ধাকে রক্ষা করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ির সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। নুসরাত জানান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সেই প্রতিবাদ তাঁর ভেতরের সুপ্ত সাহসের বহিঃপ্রকাশ ছিল। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নারীদের সুরক্ষা এবং জুলাই সনদের লক্ষ্য অর্জনে আরও অনেক জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে দেশে পূর্ণাঙ্গ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
গণ-আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে ভাই হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন মিতু ও মিম নামের দুই বোন। ৫ আগস্ট সরকারের পতনের দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে সহোদর ইসমাইল হোসেন রাব্বির মরদেহ কাঁধে নিয়ে এই দুই বোনের শোকমিছিলের দৃশ্য পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছিল। বর্তমানে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে নিয়োজিত মিম জানান, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি না ভাবলেও একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকারের কাছে তাঁর মূল প্রত্যাশা হলো, তারা যেন শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ায় এবং সমাজে চলমান বিশৃঙ্খলা ও চাঁদাবাজি দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
এদিকে আন্দোলনের শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছিলেন ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী লামিয়া রায়হান। অন্য এক নারী সহযোদ্ধাকে বাঁচাতে গিয়ে হামলার মুখে পড়ার সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। লামিয়া আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত যে বাংলাদেশের স্বপ্ন তাঁরা দেখেছিলেন, তা এখনো অনেকটাই অধরা রয়ে গেছে। উপরন্তু, জুলাইয়ের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁর ছবি ব্যবহার করা হলেও মাঠপর্যায়ের প্রকৃত সংগ্রামীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিগত আন্দোলনের সময় ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এই তরুণ সমাজ। প্রত্যেকের প্রতিবাদের ধরণ আলাদা হলেও একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার লক্ষ্য ছিল সবার এক। স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসানকে তাঁরা একটি ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে দেখলেও, সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নপূরণে এখনো দীর্ঘ পথ বাকি রয়েছে বলে মনে করেন এই সম্মুখযোদ্ধারা। তাঁদের বিশ্বাস, রাষ্ট্রে পূর্ণ জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পেলেই শহীদদের আত্মত্যাগ চূড়ান্ত সার্থকতা লাভ করবে।