শুক্রবার, 30 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

জঙ্গল সলিমপুর: সন্ত্রাসীর নামে শতকোটি টাকার খাস জমি রেজিস্ট্রি!

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে আলোচিত সন্ত্রাসী ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি জমির দলিল মাত্র একদিনের ব্যবধানে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। বাজারমূল্য অনুযায়ী এসব স্থাবর সম্পত্তির দাম প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

জঙ্গল সলিমপুর: সন্ত্রাসীর নামে শতকোটি টাকার খাস জমি রেজিস্ট্রি!

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে আলোচিত সন্ত্রাসী ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি জমির দলিল মাত্র একদিনের ব্যবধানে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। বাজারমূল্য অনুযায়ী এসব স্থাবর সম্পত্তির দাম প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

র‌্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ইয়াসিনের বিপুল পরিমাণ জমির দলিল এভাবে দ্রুত রেজিস্ট্রি হওয়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়।

সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, প্রায় দুই কোটি টাকা ঘুসের বিনিময়ে এসব দলিল রেজিস্ট্রি করেছেন সীতাকুণ্ডের সাবরেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব। অভিযোগ সামনে আসার পর তার বদলির আদেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত করেছে আইন মন্ত্রণালয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, রেজিস্ট্রি হওয়া দলিলগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এত বিপুলসংখ্যক দলিল একদিনে কেন রেজিস্ট্রি করা হলো, জমির পরিমাণ কত, কার কাছে সেগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে এবং এসব জমিতে সরকারের কোনো স্বার্থ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি জমিগুলোর বর্তমান বাজারমূল্যও যাচাই করা হবে।

নিয়ম অনুযায়ী, দলিল রেজিস্ট্রি করতে হলে দাতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। তাই পুলিশের খাতায় পলাতক আসামি হিসেবে থাকা ইয়াসিন দলিল রেজিস্ট্রির সময় সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরে বিপুল পরিমাণ সরকারি খাসজমি বিভিন্ন কৌশলে নিজের নামে বিএস রেকর্ডভুক্ত করেছিলেন ইয়াসিন। গত তিন মাস ধরে এসব জমি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রির চেষ্টা করছিলেন তিনি।

গত সোমবার সাবরেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবকে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বদলি করা হয়। বৃহস্পতিবারের মধ্যে তার নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। তবে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার আগের দিনই মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ইয়াসিনের বিপুল পরিমাণ জমির বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন তিনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বুধবার বিকেলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা আইন মন্ত্রণালয়ে মৌখিক অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে রায়হান হাবীবের বদলির আদেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত করা হয়।

বৃহস্পতিবার সকালে সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে গেলেও রায়হান হাবীবের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তার সহকারী সিরাজউদ্দিন দাবি করেন, রেজিস্ট্রি হওয়া জমিগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন। ভূমি অফিসের কাগজপত্র অনুযায়ী, এসব জমি ইয়াসিনের নামে নামজারি করা ছিল এবং খাজনাও হালনাগাদ রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও দলিল জমা দিয়ে জমিগুলো বিক্রির আবেদন করা হয়েছিল। কাগজপত্র সঠিক থাকায় দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। এসব জমির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো নির্দেশনাও ছিল না।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক জানান, বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয় তদন্ত করছে। পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ও এ বিষয়ে কাজ করছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুরে ইয়াসিন বাহিনী ও রুকন মেম্বারের প্রভাব দীর্ঘদিনের। তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় সাধারণ মানুষ অনেকটা জিম্মি। এ দুই বাহিনীর পাশাপাশি সেখানে আরও কয়েকটি উপবাহিনীর তৎপরতা রয়েছে।

গত ১৯ জানুয়ারি এক আসামিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাতে কয়েকটি মাইক্রোবাসে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করে তৎকালীন র‌্যাবের একটি দল। পরে মাইকিং করে ইয়াসিন বাহিনী ও স্থানীয়দের একটি অংশ র‌্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় র‌্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ইয়াসিনসহ তার বাহিনীর অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা হয়।

সর্বশেষ গত ২৪ মে গভীর রাতে দুই থেকে তিনশ সন্ত্রাসী রাস্তা কেটে নির্মাণাধীন র‌্যাব ও যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় র‌্যাবের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের রাতভর গোলাগুলি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০৪ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। এ ঘটনায় ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে তিন শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ।

তবে এখনো পর্যন্ত ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।