বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দাবি করেছেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে তাহসিফকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে এ শুনানি হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দীপকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন। জামিনে মুক্তি পেলে তিনি পালিয়ে গিয়ে তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন এবং ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের স্বার্থে সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়।
বেলা সোয়া ২টার দিকে দীপকে আদালতে হাজির করা হয়। তাঁকে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়েছিল। বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটের দিকে শুনানির জন্য তাঁকে এজলাসে তোলা হয়। এ সময় তাঁর হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও শরীরে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ছিল। পরে সেগুলো খুলে ফেলা হয়। বিচারক এজলাসে ওঠার পর শুনানি শুরু হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা ফিরোজ উদ্দিন রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপক্ষে কৌঁসুলি আজিজুল হক দিদারও রিমান্ড আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন।
তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও করেছিলেন তাহসিফ সাউরি। পরবর্তীতে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়া হয়। এ কারণে ভিকটিমকে খুন করা হতে পারে। সে তথ্য উদঘাটনের জন্য, এ ঘটনার সাথে আর কারা জড়িত তা জানান জন্য আসামির রিমান্ড প্রয়োজন।”
অন্যদিকে দীপের পক্ষে আইনজীবী মনিরুল ইসলাম ও মুতাসিম বিল্লাহ রিমান্ড আবেদন বাতিলের পক্ষে শুনানি করেন।
মনিরুল ইসলাম বলেন, “ভিকটিমের সাথে আসামির ৬ বছরের সম্পর্ক, পারিবারিকভাবে এ সম্পর্ক। ভিকটিমের বাবা কিন্তু একটি বারও বলেননি আসামি ঘটনার সাথে জড়িত। আর ভিকটিম বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। রাত ২টার দিকে তিনি কেন মাদক আস্তানায় যাবেন, তা বোধগম্য নয়।”
তিনি আরও বলেন, “আসামি মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার। আমরাও চাই সত্য উদঘাটন হোক। আসামি কিন্তু প্রথম থেকে সহযোগিতা করে আসছেন। এটা হত্যা না আত্মহত্যা, সন্দেহ হয়। আর ভিকটিমের শরীরে কিন্তু কোনো আঘাতের চিহ্ন নাই। তার পরিবার কিন্তু মামলা করতে চায়নি। আমরাও সত্য উদঘাটনের পক্ষে। এ কারণে জামিন আবেদন করিনি।”
দীপের আরেক আইনজীবী মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, “আসামি ঘটনার সাথে জড়িত নন। তিনি জড়িত থাকলে কিন্তু বাসায় থাকতেন না। প্রথম থেকে কিন্তু তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। আমরাও চাই প্রকৃত রহস্য উঠে আনুক।”
দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত দীপকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।
শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার সাংবাদিকদের বলেন, দীপের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন, অপরাধের আলামত নষ্ট করা বা অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচানো এবং যৌথ দায়বদ্ধতার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ অভিযোগে দণ্ডবিধির ২০৩, ২০১ ও ৩৪ ধারায় মামলা করা হয়েছে।
দিদার বলেন, “যিনি হত্যা হয়েছেন, ভিকটিম হয়েছেন, গত স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার সময় যে ভিডিওটা আপনারা দেখেছেন…পলাতক শেখ হাসিনা পালিয়ে যাচ্ছেন, এই যে ভিডিওটা হয়েছে, উনি এই ভিডিওটা করেছিলেন এবং মিডিয়াতে দিয়েছিলেন। যার দরুন চব্বিশে এ আন্দোলন সফল হয়েছিল, এ কারণে হয়তো, আজকের এই ভিকটিমকে মারার পরিকল্পনা হয়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছেন।”
রিমান্ডের আদেশের পর দীপকে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় এক স্বজনকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “আমি ফুললি স্ট্রং।” এ সময় তাঁকে নিয়ে দুশ্চিন্তা না করতেও বলেন তিনি।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তিন দিনেও মামলা না হওয়ায় তাঁকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, তা নিয়ে আলোচনার মধ্যে শুক্রবার রাতে তাঁকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই রাতেই তাহসিফের বাবা হত্যা মামলা দায়ের করলে দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণকারী হিসেবে আলোচনায় থাকা তাহসিফ সাউরির ভাসমান মরদেহ বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ‘দীপের ডাকে’ বাসার নিচে নেমে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। বৃহস্পতিবার দীপ জানিয়েছিলেন, তাঁরা একসঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়েছিলেন। এরপর উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি।
দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়ার পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। ‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথাও স্বীকার করেছিলেন দীপ। পরে শুক্রবার তাঁকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শন করেন পিবিআই কর্মকর্তারা।