পোশাকশ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবিতে রোববার রাজধানী ঢাকা, সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলায় জড়িত ব্যক্তিদের কঠোরভাবে দমনে সরকারের নির্দেশের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রোববার রাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পোশাক খাতের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কী নির্দেশনা দিয়েছেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছেন, দিক নির্দেশনা দিয়েছেন যাতে পোশাক শ্রমিকদের স্বার্থকে রক্ষা করা হয়, তাদের জীবনমান উন্নত হয় এবং বাংলাদেশে উৎপাদন ও উন্নয়ন যাতে ব্যাহত না হয়, রপ্তানি যাতে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। সমস্ত বিষয়ে লক্ষ্য রেখেই যেন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনুরোধ করেছি যারা সহিংসতার সাথে জড়িত থাকবে, যারা উশৃঙ্খল আচরণ করবে, অহেতুক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে, অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করবে তাদেরকে কঠোরভাবে দমন করা হবে।’
রোববার সন্ধ্যা ৬টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এ বৈঠক শুরু হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিন এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।
সাভারে অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি
রোববার সকালে সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানায় কাজকর্ম স্বাভাবিক থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারখানার সামনে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সাভারে অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, সকালে নিশ্চিতপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএইজ গ্রুপের একটি কারখানা ও ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান করেন।
এরপর বেলা পৌনে ১১টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুরে শারমিন গ্রুপের কারখানার সামনে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা। বেতন বাড়ানোর দাবিতে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। শিল্প পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরে পাশে অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানালে শ্রমিকেরা তা মেনে নেন।
পরে শারমিন গ্রুপের শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তারা। এ পরিস্থিতিতে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে কারখানাটিতে ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। একই এলাকায় হা-মীম গ্রুপ, নিউএইজসহ আশপাশের আরও কয়েকটি কারখানাও ছুটি ঘোষণা করে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন বলেন, কাজ বন্ধ রেখে কারখানায় অবস্থান করা কয়েকজন শ্রমিক তাকে জানিয়েছেন, দাবিদাওয়া নিয়ে কর্তৃপক্ষের কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলেননি। এতে শ্রমিকদের মধ্যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
খায়রুল মামুন বলেন, কাজ বন্ধ থাকার কারণে কোনো কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হলে দাবিদাওয়া সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না পেয়ে শ্রমিকেরা ক্ষুব্ধ হন। একপর্যায়ে তারা সড়কে অবস্থান নেন এবং অন্য কারখানার শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যুক্ত করার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান তিনি।
গাজীপুরে ৩০ কারখানায় ছুটি, ঝুটের গোডাউন-পিকআপে আগুন
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অন্তত ৩০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি কারখানার ঝুটের গোডাউন ও একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রোববার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে উপজেলার চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে।
এরপর রতনপুর এলাকার করনী নিট কম্পোজিট, নিট এশিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেন। কারখানায় হাজিরা দেওয়ার পর তারা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতির কারণে আশপাশের কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারায় গাড়িটি পুড়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর একই এলাকায় ট্রপিক্যাল নামের একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে আগুন দেওয়া হয়।
মিরপুরে পাঁচ ঘণ্টা অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রোববার সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে মিরপুর-১১, মিরপুর-১২ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। দুপুর ২টা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ চলে। এ সময় মিরপুরের একাধিক সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষ, যাত্রী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে দুপুরের দিকে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে সড়কপথের পাশাপাশি মেট্রোরেল চলাচলও ব্যাহত হয়।
এ ছাড়া মিরপুরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকার প্রবেশপথে নিরাপত্তার স্বার্থে ফটক বন্ধ রাখা হয়। ফলে রিকশা ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে অনেক এলাকায় প্রবেশ করা যায়নি। পথচারীদের হেঁটে কিংবা বিকল্প পথ ব্যবহার করে গন্তব্যে যেতে হয়েছে।
অন্যদিকে বিকল্প সড়ক ও আবাসিক এলাকার ভেতরের গলিতে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। এ সুযোগে রিকশা ও মোটরসাইকেলের ভাড়া কয়েক গুণ বাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
ডিএমপির ট্রাফিক মিরপুর বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজল হক বকশী বলেন, “রাস্তায় আন্দোলন হয়েছে, ফলে ব্যাপকভাবে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সকাল থেকে বিভিন্ন জায়গায় ব্লকেড ছিল। এর ফলে যান চলাচল হয়নি।” পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
২৮ জন আটক, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী দাবি পুলিশের
মিরপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর ২৮ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, আটক ব্যক্তিরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। তারা শ্রমিকদের আন্দোলনে ঢুকে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার চেষ্টা করছিলেন।
ঘটনাস্থল থেকে ১১ জনকে আটকের তথ্য জানান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান। তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিরা বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে রাকিব ও আরিফ নামের দুজন রয়েছেন। বাকিদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
এদিকে ডিএমপির মিরপুর বিভাগ আরও ১৭ জনকে আটক করেছে বলে জানিয়েছেন এ বিভাগের উপকমিশনার আবু নাসের রিকাবদার। তিনি বলেন, “সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অন্তত আরও ১৭ জন আটক আছে। পরে তাদের নাম ও পরিচয় জানানো হবে। আটকরা নাশকতার পরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের হয়ে মিছিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।”
আন্দোলনের মুখে নতুন মজুরি বোর্ড
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। রোববার এ বোর্ড গঠন করা হয়। এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বা গেজেটও প্রকাশের কথা জানানো হয়েছে।
এর আগে শনিবার মালিক, শ্রমিক ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে প্রায় চার ঘণ্টার আলোচনার পর তিনি বলেন, শ্রমিক সংগঠনগুলোর, বিশেষ করে পোশাকশ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে রোববার মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রোববার মিরপুর ও গাজীপুরে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের মধ্যেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ শ্রমমন্ত্রীর
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তার দাবি, কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে।
রোববার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাধারণ শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি বোর্ড এবং পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে আলাদা বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন মন্ত্রী। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে সরে এসে কাজে ফেরার আহ্বান জানান তিনি।
শ্রমমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকরা কী বললেন? বললেন যে এখনো (মজুরি বোর্ড) ঘোষণা হয় নাই। অথচ এটা আপনাদের মাধ্যমে তাদের নেতাসহ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে আমরা রোববারই ঘোষণা দেবো। এটা তো আমার মনে হয় খুবই স্পষ্ট (ভেরি মাচ ক্লিয়ার) যে কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন কাজগুলো করছে যেন অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়।