বাংলাদেশে কারাবন্দী পাঁচ সাংবাদিকসহ এশিয়ার আটটি দেশের আটক সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক অধিকার সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ, তাঁদের সঙ্গে সংঘটিত নির্যাতন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বন্দী দিবস উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ আহ্বান জানায় সিপিজে। তবে বাংলাদেশে কারাবন্দী পাঁচ সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করেনি সংগঠনটি।
পোস্টে সিপিজে জানায়, এশিয়ার আটটি দেশে বর্তমানে সাংবাদিকেরা কারাবন্দী রয়েছেন। দেশগুলোর মধ্যে চীনে ৫০, মিয়ানমারে ৩০, ভিয়েতনামে ১৬, কম্বোডিয়ায় ৫, বাংলাদেশে ৫, ভারত ও আফগানিস্তানে ১ জন করে এবং ফিলিপাইনে ১ জন সাংবাদিক কারাগারে রয়েছেন।
এসব দেশের সরকারের প্রতি আটক সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে এবং তাঁদের সঙ্গে সংঘটিত নির্যাতন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বিশ্ব এ পরিস্থিতি থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে না। সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয় বলেও উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
সিপিজের সর্বশেষ বার্ষিক কারাগার জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৩০০ জনের বেশি সাংবাদিক কারাবন্দী ছিলেন। টানা পঞ্চম বছরের মতো বিশ্বে কারাবন্দী সাংবাদিকের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিস্তার এবং সশস্ত্র সংঘাতের বৃদ্ধি এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ বলে মনে করছে সংগঠনটি।
জরিপে দেখা গেছে, টানা তিন বছর ধরে সাংবাদিকদের সবচেয়ে বেশি কারাগারে রেখেছে চীন। ২০২৫ সালে দেশটিতে অন্তত ৫০ জন সাংবাদিক বন্দী ছিলেন। ৩০ জন সাংবাদিককে কারাগারে রেখে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মিয়ানমার। আগের বছর দেশটি ছিল তৃতীয় স্থানে। অন্যদিকে ২৯ জন সাংবাদিককে কারাগারে রেখে দ্বিতীয় স্থান থেকে তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে ইসরায়েল।
এ ছাড়া ২৪ জন সাংবাদিককে কারাগারে রেখে প্রথমবারের মতো শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে আজারবাইজান। ২০১৮ সালের পর এই প্রথম দেশটি তালিকাভুক্ত হলো। আগের বছরের তুলনায় সেখানে কারাবন্দী সাংবাদিকের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া, বেলারুশ, মিসর ও ইরিত্রিয়ায় গত পাঁচ বছরের মতোই সাংবাদিকদের কারাবন্দী রাখার পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
সাংবাদিকদের কারাবন্দী রাখার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অবস্থানও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে সিপিজে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটি ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের ব্যাপক হারে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা জানানো হয়নি। আবার কাউকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলের নাগরিকেরা ব্যাপক নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করলেও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েল ১১০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে।
কারাগারে সাংবাদিকদের অনেক সময় নিষ্ঠুর ও জীবননাশের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে রাখা হয়। মুক্তি পাওয়া এক ফিলিস্তিনি বন্দী কারাগারের পরিস্থিতিকে ‘জীবিত মানুষের কবরস্থান’ বলে বর্ণনা করেছেন। অনেক সাংবাদিককে বছরের পর বছর এমন পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
সিপিজের ২০২৫ সালের জরিপে অন্তর্ভুক্ত সাংবাদিকদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি পাঁচ বছরেরও বেশি সময়ের সাজা ভোগ করছেন। প্রায় অর্ধেকের ক্ষেত্রে এখনো কোনো সাজা ঘোষণা করা হয়নি। তাঁদের মধ্যে ২৬ শতাংশ সাংবাদিক পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে সাজা ছাড়াই কারাবন্দী রয়েছেন।
সিপিজে বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রত্যেক বন্দীর ক্ষেত্রে যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণ এবং অযৌক্তিক বিলম্ব ছাড়াই বিচার সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। দীর্ঘ সময় ধরে বিচার ছাড়াই সাংবাদিকদের আটক রাখা এ আইনি বাধ্যবাধকতার লঙ্ঘন।