ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ভোটাধিকার নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে জেন-জির সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। শনিবার সকালে দিল্লিতে বিক্ষোভ করতে জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীদের অনেককে আটক করেছে পুলিশ।
ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা এই প্রক্রিয়া বাতিল এবং ব্যাপক নির্বাচনী সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মধ্য নয়াদিল্লির বিভিন্ন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুরো শহরে প্রায় ৩০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপককেও আটক করেছে পুলিশ। শনিবার ভোরে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর খবরে বলা হয়, মুম্বাই থেকে নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে অবতরণের পরই পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। দলের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, অপর দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকেও বিমান অবতরণের পরপরই আটক করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার নয়াদিল্লিগামী সব ট্রেন বাতিল, ৫০টির বেশি মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশ না নিতে সতর্ক করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে দিল্লিগামী বাস ও ট্রেন থেকে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে আটক করা হয়েছে। রাজধানী থেকে শত শত কিলোমিটার দূরের শহরগুলোতেও অনেককে গৃহবন্দী করে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের দমনমূলক পদক্ষেপ জোরদার হওয়ার পর দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ককরোচ আন্দোলন। তবে এসব পদক্ষেপে দমে না গিয়ে বারবার রাজপথে ফিরে আসার অঙ্গীকার করেছেন বিক্ষোভকারীরা।
জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে
দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের ওপর দমনপীড়নের ঘটনা ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। ওই সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত করেছিলেন, সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেছিলেন এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের কারাগারে পাঠিয়েছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ককরোচ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক লেখেন, নরেন্দ্র মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি অবস্থা চালু করেছেন। তিনি বলেন, ভয় দেখিয়ে আন্দোলন থামানো যাবে না এবং দেশের তরুণ সমাজ আর তাঁকে ভয় পায় না।
দিল্লির কনাট প্লেসের আউটার সার্কেলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ২৯ বছর বয়সী সন্তোষ কুমার আন্দোলনকারীদের আটক হতে দেখে হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য, ব্যারিকেডের সামনে তরুণদের আটক করা হলেও আন্দোলন থামছে না। ১০ জনকে আটক করলে আরও ৫০ জন সেখানে হাজির হচ্ছেন। তাঁর মতে, মোদির রাজনৈতিক সময় শেষের দিকে এবং তিনি ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন না।
বামপন্থী ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভানেত্রী নেহা বোরা মোদি সরকারের সঙ্গে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, ব্রিটিশ শাসকেরা যেমন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন থামাতে পারেনি, তেমনি বর্তমান পরিস্থিতিতেও আন্দোলন দমিয়ে রাখা কঠিন হবে। তিনি সাধারণ মানুষকে বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। শনিবার সকালে পুলিশের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে তরুণদের অনেকে তাঁর আহ্বানে সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেন।
সন্তোষ কুমার আরও বলেন, নেপাল ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতের মানুষের নিজেদের দেশ পুনর্নিয়ন্ত্রণের সময় এসেছে।
এদিকে গুরুগ্রাম থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী প্রকৌশলী সমীর এরশাদ তাঁর ৫৭ বছর বয়সী মা শিবা আবদিকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে কনাট প্লেসের ব্যারিকেডের দিকে এগিয়ে যান। শিবা আবদি বলেন, দিল্লিতে এ ধরনের দমনপীড়ন আগে কখনো দেখেননি। তাঁর প্রশ্ন, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ না দিয়ে সরকার কেন এলাকাটিকে দুর্গে পরিণত করেছে এবং সাধারণ নাগরিকদের এতটা ভয় পাচ্ছে কেন।
গৃহবন্দী
ভারতের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের খবর গত মাসে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। সমালোচকদের অভিযোগ, বিতর্কিত কিছু নীতির কারণে কোটি কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন।
একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা নিয়ে অপর দুই নির্বাচন কমিশনারের তোলা আপত্তি উপেক্ষা করে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন।
ভারত এমন কয়েকটি দেশের একটি, যেখানে প্রতিটি নাগরিককে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সমালোচকদের মতে, চলমান সংশোধন প্রক্রিয়া দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিকে বদলে দিচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের নিজেদের ভোটাধিকার প্রমাণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মুসলিম, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণি, সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরেক বামপন্থী ছাত্র সংগঠন স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) সাহারানপুর জেলা সমন্বয়ক আরিফকে গত বৃহস্পতিবার থেকে তাঁর বাড়িতে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। তাঁর বাড়িটি নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ১২৫ মাইল দূরে।
নিরাপত্তার কারণে পূর্ণ নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরিফ জানান, গভীর রাতে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর বাড়িতে এসে দরজায় ধাক্কা দেন এবং তাঁর বাবা-মায়ের কাছে অবস্থান জানতে চান।
তিনি বলেন, সাহারানপুরের বাড়িতে তাঁকে ২৪ ঘণ্টা পুলিশি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে দিল্লিতে গিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ফৌজদারি মামলায় ফাঁসানো এবং ভবিষ্যৎ নষ্ট করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
প্রথমবারের মতো গৃহবন্দী হওয়া আরিফ বলেন, তিনি দিল্লিতে গিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে, মোদির রাজনৈতিক সময় শেষ হয়ে এসেছে।
‘সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে’ মোদি
চলতি সপ্তাহে নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় থাকার ২৫ বছর উদ্যাপন করেছে। ২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে বিতর্কিত ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। ২০১৪ সাল থেকে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদিকে বর্তমান সময়ের মতো এতটা দুর্বল অবস্থানে আগে দেখা যায়নি।
গত জুলাইয়ে ককরোচ আন্দোলনের কারণে নয়াদিল্লির প্রধান সড়কগুলো অচল হয়ে পড়েছিল। ওই পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
মোদির জীবনীকার ও লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে, মোদি এমন একজন নেতার ভাবমূর্তি ধরে রাখতে চান, যিনি জনদাবির সামনে কখনো নতিস্বীকার করেন না এবং যাঁকে পরাজিত করা যায় না। এ কারণেই এবার আন্দোলনকারীদের মধ্য দিল্লিতে জড়ো হওয়া ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, জনগণের দৃষ্টিতে মোদি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে নিচু অবস্থানে রয়েছেন। তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। দেশের প্রধান স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্রের বড় অংশ এবং সরকারি সংস্থাগুলো এখনো তাঁর শক্ত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অব্যাহত প্রতিবাদের মুখে সাধারণ মানুষকে সংকট থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম নেতা হিসেবে মোদির ভাবমূর্তি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও অধিকারকর্মী প্রশান্ত ভূষণের মতে, মোদি সরকার জনগণকে দেখে ভীত বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, ভারতের মানুষ এখন জেগে উঠছে এবং সরকারের কাছে জবাবদিহি চাইছে। তাঁর ভাষ্য, সরকার যখন ভয় পায়, তখন ক্ষমতায় টিকে থাকতে কঠোর পথ বেছে নেয়। তবে এই দমনপীড়নের ফলে আরও বেশি মানুষ রাজপথে নেমে আসতে পারে।