সোমবার, 12 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

হুথিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা ইয়েমেন সরকারের

সৌদি জোটের পক্ষ থেকে মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে অর্ধশত বিমান হামলার প্রত্যুত্তরে এই আক্রমণ চালানো হয়।

হুথিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা ইয়েমেন সরকারের
বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত সমগ্র এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশজুড়ে সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে বৈধ সরকারের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির বরাতে জানা যায়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক মোর্চা ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে তীব্র সংঘাতের জের ধরে এই সিদ্ধান্ত এলো।

রোববার প্রচারিত এক বিশেষ টেলিভিশন বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট আল-আলিমি জানান, প্রজাতন্ত্রের সমস্ত অঞ্চল পুনর্দখল এবং সামগ্রিক জাতীয় ভূখণ্ডে শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার নির্দেশ জারি করেছেন তিনি।

প্রেসিডেন্টের এই বার্তার আগে ইরান সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের সরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আরামকোর একাধিক তেল স্থাপনায় সফল আঘাত হানার দাবি করে। তাদের ভাষ্যমতে, সৌদি জোটের পক্ষ থেকে মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে অর্ধশত বিমান হামলার প্রত্যুত্তরে এই আক্রমণ চালানো হয়। যদিও রিয়াদের পক্ষ থেকে এই দাবির ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

বিদ্রোহী বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি গণমাধ্যমকে জানান, সৌদি রাজধানী রিয়াদ এবং দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ খুরাইস এলাকার স্থাপনাগুলোকে নিশানা করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও মানববিহীন উড়োজাহাজ দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল আঘাতের ফলে সেখানে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। তবে এই ক্ষয়ক্ষতির সত্যতা রিয়াদ প্রশাসন নিশ্চিত করেনি।

এদিকে হুথি সংশ্লিষ্ট আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের খবরে প্রকাশ হয়েছে, সৌদি জোটের চলমান বিমান হামলায় অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সরকারি বাহিনীও রাজধানী সানা, সাদা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ অঞ্চলে বিদ্রোহীদের অবস্থানের ওপর পাল্টা আঘাত হানার তথ্য জানিয়েছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের সবচেয়ে উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে তাইজ। প্রশাসনিকভাবে এটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনের সাথে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ রুটটির নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে বিদ্রোহীদের হাতে। বার্তা সংস্থা এএফপির সাথে আলাপকালে ইয়েমেনের তিনজন সামরিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, কৌশলগত সড়কটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তাইজ এখন কার্যত পূর্ণ অবরোধের মুখে। আন্তর্জাতিক থিংকট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি উল্লেখ করেন, পুরো তাইজের দখল না পেলেও এডেন থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে হুথিরা।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজধানী সানা বিদ্রোহীদের হাতে অবরুদ্ধ রয়েছে। সরকার ও তাদের মিত্রদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহীদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের অবিরাম চেষ্টা চালানো হলেও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে মাঠপর্যায়ে হুথিদের আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে।

২০১৪ সালে রাজধানী পতনের মাধ্যমে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তা পরবর্তী বছর সৌদি জোটের হস্তক্ষেপে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতার সুযোগে গত জুলাই থেকে দেশটির সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। সম্প্রতি অতর্কিত অভিযানের মাধ্যমে লোহিত সাগরীয় উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে বিদ্রোহীরা, যা হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে সৌদির জ্বালানি পরিবহন পথকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, ভূকৌশলগত এই আধিপত্য হুথিদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক তেহরানকে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। তবে এই পাল্টাপাল্টি রক্তক্ষয়ী সংঘাত ইতোমধ্যে দারিদ্র্য ও দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটে জর্জরিত সাধারণ ইয়েমেনিদের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।