সোমবার, 12 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

জিবুতি উপকূলে নৌকাডুবি, ১৩৯ জনের সলিলসমাধি

বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার ভোরের মধ্যবর্তী সময়ে এই বিপর্যয় ঘটে। এডেন উপসাগরীয় অঞ্চলের বাব আল-মান্দেব প্রণালির সন্নিকটে জিবুতির পূর্বাঞ্চলীয় গুহেরে উপকূলের কাছে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বোঝাই নৌকাটি পানিতে তলিয়ে যায়।

জিবুতি উপকূলে নৌকাডুবি, ১৩৯ জনের সলিলসমাধি
পূর্ব আফ্রিকার দেশ জিবুতির উপকূলবর্তী এলাকায় এক মর্মান্তিক নৌকাডুবিতে কমপক্ষে ১৩৯ জন যাত্রীর প্রাণহানি ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর থেকে এখনও হদিস মিলছে না আরও ৮৪ জনের। প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু রয়েছে।

জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) আনুষ্ঠানিকভাবে এই হৃদয়বিদারক তথ্য নিশ্চিত করেছে।

দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের বরাতে রোববার প্রচারিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আইওএম উল্লেখ করে, বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার ভোরের মধ্যবর্তী সময়ে এই বিপর্যয় ঘটে। এডেন উপসাগরীয় অঞ্চলের বাব আল-মান্দেব প্রণালির সন্নিকটে জিবুতির পূর্বাঞ্চলীয় গুহেরে উপকূলের কাছে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বোঝাই নৌকা পানিতে তলিয়ে যায়।

নৌযানটিতে তিন শতাধিক আরোহী অবস্থান করছিলেন এবং সেটি জিবুতি উপকূল ছেড়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের দিকে এগোচ্ছিল। ঘটনার পর ৮০ জনের বেশি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যাদের সবাই পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার নাগরিক।

জিবুতিতে নিযুক্ত আইওএমের মিশনপ্রধান আলেক্সান্দ্রে কোয়িসাক জানিয়েছেন, দুর্গতদের তাৎক্ষণিক জরুরি ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে তাদের উদ্ধারকারী দল স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে একযোগে তৎপরতা চালাচ্ছে। তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত এই প্রাণহানিতে গভীর সমবেদনা জানান।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া এক বক্তব্যে কোয়িসাক ব্যাখ্যা করেন, প্রাণহানির যে সংখ্যা এখন পর্যন্ত নথিবদ্ধ হয়েছে, তা মূলত স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দাফন সম্পন্ন হওয়া মরদেহের ভিত্তিতে তৈরি। জীবিত ফিরে আসা অভিবাসীদের কেউ কেউ উদ্ধার হওয়া মরদেহ নিজেরাও দাফন করেছেন। তবে প্রশাসনিক নিরীক্ষা শেষে সেগুলো চূড়ান্ত সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ফলে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি মন্তব্য করেন, জীবিকার তাগিদে উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় অভিবাসীরা চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে এই রুটে পা বাড়ান। এই মর্মান্তিক বিপর্যয় আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সাগরপথের এই যাত্রা কতটা প্রাণঘাতী ও ঝুঁকিপূর্ণ।

আফ্রিকার শৃঙ্গ বা হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জন্য জিবুতি ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করা একটি বহুল ব্যবহৃত কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক বিকল্প। ভৌগোলিকভাবে প্রণালিটির সংকীর্ণতম অংশের বিস্তৃতি প্রায় ২০ কিলোমিটার।

কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার স্বপ্ন নিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এই জলপথ ব্যবহার করে মূলত উপসাগরীয় ধনী রাষ্ট্রগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তবে সম্প্রতি ইরান কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এই অঞ্চলে নতুন অস্থিরতা উসকে দিয়েছে। ফলে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সরকারি বাহিনী ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাতও তীব্র রূপ নিয়েছে। অথচ জীবন বাজি রেখে এমন সর্বনাশা বিপদের মুখেই ছুটে চলেছেন অভিবাসীরা।

আইওএমের তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বিগত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি ইথিওপীয় নাগরিক সীমান্তবর্তী জিবুতিতে প্রবেশ করেছেন।

সংস্থাটির বার্ষিক পরিসংখ্যান বলছে, বিগত বছরেও পাঁচ লাখের বেশি মানুষ এই নৌপথ পাড়ি দিয়ে ইয়েমেনের উপকূলে ভেড়ার ঝুঁকি নিয়েছিলেন। সেই বিপজ্জনক যাত্রায় প্রায় ৯০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে কিংবা তারা চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান।

জিবুতি এখন আর শুধু অন্যান্য দেশে পাড়ি দেওয়ার প্রারম্ভিক ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। ইয়েমেনের মাটিতে সাম্প্রতিক সংঘাতের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সেই ভূখণ্ড থেকেও উল্টো হাজার হাজার শরণার্থী বাঁচার তাগিদে এখন জিবুতিতে আশ্রয় খুঁজছেন।