দেশের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও বহর বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমেরিকার খ্যাতনামা উড়োজাহাজ নির্মাণকারী সংস্থা বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন ১১টি বিমান ক্রয়ের আনুষ্ঠানিক সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় সেখানকার গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের লাউঞ্জে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক মিট দ্য প্রেসে সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন তিনি।
মাহদী আমিন উল্লেখ করেন, এদিন বোয়িং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেশের একটি সুদূরপ্রসারী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার আওতায় জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সমৃদ্ধ করতে আরও এগারোটি অত্যাধুনিক বিমান সংগ্রহ করা হবে।
এর আগে গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে বোয়িংয়ের সঙ্গে আরেকটি চুক্তি করেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। আগের চুক্তিতে বাংলাদেশের গুনতে হবে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এই এয়ারক্রাফটগুলো বিমানকে সরবরাহ করবে বোয়িং।
নতুন চুক্তির ১১টি উড়োজাহাজের দাম জানা যায়নি। সব মিলিয়ে বিমানের বহরে বোয়িংয়ের নতুন ২৫টি উড়োজাহাজ যোগ হচ্ছে। নতুন চুক্তির জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর।
নতুন চুক্তি সম্পাদন পর্বে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকেরা। যাদের মধ্যে দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লান্ডাউ, বাণিজ্যবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উইলিয়াম কিমিট এবং মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরসহ অন্যান্য কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন।
উপদেষ্টা জানান, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আকাশপথে যাত্রীসেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং নতুন নতুন গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার তাগিদ থেকেই এই বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ। তিনি বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে ঢাকার বাণিজ্যিক সহযোগিতা দীর্ঘদিনের পুরনো, তবে বিমানের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মাফিক ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গেও ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক আলোচনার বিকল্প পথ খোলা রয়েছে।
বিমান কেনার যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, দেশের এভিয়েশন বাজার ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে এবং নতুন নতুন রুটে যোগাযোগ স্থাপনের ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার কারণে অতিরিক্ত উড়োজাহাজ সংগ্রহ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই বোয়িংয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি দল সরকারপ্রধানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হয়।
চলমান সফর প্রসঙ্গে মাহদী আমিন জানান, নিউইয়র্কে দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী জনস্বাস্থ্য, টেকসই কৃষি, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা সমস্যা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে একাধিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেন।
আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের চিকিৎসা ও কৃষিব্যবস্থায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণ, ফসলের উৎপাদন বাড়ানো এবং দেশীয় ব্যবস্থাপনায় জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতা অর্জনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এদিকে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশ ও আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার যৌথ প্রয়াসে জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে একটি বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সেখানে বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীর নিজ বাসভূমে মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে বৈশ্বিক সহায়তার তাগিদ দেওয়া হয়। পাশাপাশি রাখাইন অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং বর্বরোচিত নিপীড়নের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিতের দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে এক ডজনেরও বেশি লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার বহন করছে ঢাকা। আন্তর্জাতিক স্তরে আর্থিক অনুদান ক্রমশ হ্রাস পাওয়ায় দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা কাটাতে বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের বলিষ্ঠ আর্থিক ও নৈতিক পাশে থাকা প্রয়োজন।
সফরকালে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সহযোগিতা জোরদার করার ওপর ঐকমত্য হয়। এছাড়া ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান ভূরাজনৈতিক সংঘাতের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ঢাকা সবসময় সংঘাত পরিহার করে শান্তিপূর্ণ পথ অনুসরণে বিশ্বাসী এবং বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ মধ্যস্থতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং সেখানে কর্মরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে বলেই শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বিষয়ে তিনি জানান, পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ ও অর্থায়ন নিশ্চিতের জোরালো দাবি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের ভেতরে নদী খনন, ব্যাপক সবুজায়ন, সৌর ও পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুতের বিস্তার এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসারের মাধ্যমে দূষণ কমানোর সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রতিবেশী ভারত ও চীনের ভূমিকা সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমস্যা সমাধানে বহুমুখী ও দ্বিপাক্ষিক সব পথেই কাজ করছে সরকার। বেইজিং বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হওয়ায় তাদের সঙ্গে নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং নেপিদোসহ সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখা হয়েছে।
কূটনীতির মৌলিক নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব বিকল্প উন্মুক্ত রাখা আবশ্যক এবং আলোচনার দ্বার কখনই রুদ্ধ করা সমীচীন নয়।
চার দিনের সফরের অবশিষ্ট দিনগুলোর তথ্য জানিয়ে তিনি নিশ্চিত করেন যে, পরবর্তী কার্যদিবসে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে সরকারপ্রধান নিজের মাতৃভাষা বাংলায় আনুষ্ঠানিক বক্তব্য উপস্থাপন করবেন।
প্রেস ব্রিফিং চলাকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর, শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সরকারের দায়িত্বশীল জনসংযোগ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।