সোমবার, 21 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

বেনজীরকে ফেরাতে ‘ব্যর্থ’ সরকার, সংসদে বিরোধী দলের ক্ষোভ

মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, বেনজীরকে দেশে ফেরাতে এ পর্যন্ত সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সংসদে দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল কি না এবং নথিপত্রে কোনো আইনি বা পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল কি না, তাও জানাতে হবে।

বেনজীরকে ফেরাতে ‘ব্যর্থ’ সরকার, সংসদে বিরোধী দলের ক্ষোভ
সংসদ অধিবেশন। ফাইল ছবি

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে জাতীয় সংসদে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্তি এবং পরে তার সেন্ট লুসিয়ায় যাওয়ার খবরকে সরকারের বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৭ ধারায় দেওয়া বক্তব্যে বিষয়টি উত্থাপন করেন ঢাকা-১৮ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)।

তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম, অর্থপাচার ও দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদ ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত ১৪ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির পরও তার জামিনে মুক্তি এবং পরে সেন্ট লুসিয়ায় (ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র) যাওয়ার ঘটনা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার গুরুতর ব্যর্থতা।

মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, বেনজীরকে দেশে ফেরাতে এ পর্যন্ত সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সংসদে দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল কি না এবং নথিপত্রে কোনো আইনি বা পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল কি না, তাও জানাতে হবে।

এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় বেনজীর কীভাবে ছয়টি দেশের পাসপোর্ট পেয়েছেন, এ বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তার অগ্রগতি কী—তা সংসদকে জানানোর দাবি জানান তিনি।

বেনজীরের দেশ-বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং সেন্ট লুসিয়া থেকে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, থাকলে তা বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়েও সংসদকে অবহিত করার দাবি জানান এই সংসদ সদস্য।

তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবার, গুমের শিকার পরিবার এবং ন্যায়বিচার প্রত্যাশী মানুষের স্বার্থে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘আমি প্রতিশোধ চাই না, বিচার চাই’

জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকয়া বেগম বলেন, শহীদ পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার। যারা বিগত সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, বেনজীর আহমেদ তাদের অন্যতম বলে দাবি করেন তিনি।

রোকয়া বেগম বলেন, বেনজীরের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম, অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন, অর্থপাচার, আর্থিক অনিয়ম, পাসপোর্ট জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া এবং বিচার নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়। একজন অভিযুক্তকে আইনের আওতায় এনে মামলা পরিচালনা ও আদালতের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সরকারের কাছে বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার বর্তমান অগ্রগতি জানতে চান তিনি। একই সঙ্গে সেন্ট লুসিয়ায় তার বর্তমান অবস্থান কী এবং তিনি সেখানে হেফাজতে আছেন কি না, সেটিও স্পষ্ট করার দাবি জানান।

রোকয়া বেগম বলেন, ভবিষ্যতে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি বিদেশে অবস্থান করলে তার বিরুদ্ধে মামলা, সম্পদ শনাক্তকরণ, প্রত্যাবর্তন, প্রত্যর্পণ ও বিচার—এই প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি সংসদে নিয়মিত জানানোর ব্যবস্থা করা উচিত।

নিজের স্বামী চিকিৎসক ফয়েজ আহমেদের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারহীনতার কারণে তিনি নিজেও ভুক্তভোগী। তার দাবি, ফয়েজ আহমেদকে বাড়ির ছাদে নিয়ে হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের পর গুলি করে ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্ট এবং বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার অভিযোগও করেন তিনি।

তিনি বলেন, বেনজীরের মতো ব্যক্তিরা যদি বিদেশে গিয়ে আইনের আওতার বাইরে থেকে যান, তাহলে স্বজনহারা পরিবারগুলোর ক্ষত আরও গভীর হয়। তার দাবি, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার দেশ-বিদেশের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং গুম-হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

‘দুবাইয়ের আইন অনুযায়ী বিচার চলছে’

ফরিদপুর-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, বেনজীর আহমেদ দীর্ঘদিনের ফ্যাসিস্ট শাসনের সহযোগী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বেনজীরকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তারে বাংলাদেশ সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

দুবাই থেকে বেনজীর কীভাবে সেন্ট লুসিয়ায় গেলেন, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা দাবি করেন তিনি।

শহিদুল ইসলাম বলেন, সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সাফল্য দেখিয়েছে। তাই বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা আরও বাড়ানো উচিত।

‘বেনজীর ছিলেন গুম-নির্যাতনের অন্যতম বাস্তবায়নকারী’

পটুয়াখালী-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেন, বেনজীর আহমেদ শুধু পুলিশের একজন কর্মকর্তা ছিলেন না, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার অন্যতম সহযোগী ছিলেন।

তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন, গুম ও নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনায় বেনজীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদ গড়েছেন বলেও দাবি করেন এই সংসদ সদস্য।

বেনজীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারি চাকরির দীর্ঘ সময়ে তিনি যে পরিমাণ বেতন পেয়েছেন, তার তুলনায় তার সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। তার পরিবারের সম্পদের বিষয়েও তদন্ত প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করে মোশাররফ হোসেন বলেন, এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আরও কার্যকর কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

একই সঙ্গে সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় বেনজীর কীভাবে ছয়টি দেশের পাসপোর্ট পেয়েছেন, তা তদন্ত করে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

‘বেনজীর সেন্ট লুসিয়ায় যাননি, দুবাইয়ে আছেন’

সংসদে বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বেনজীর আহমেদকে ‘জঘন্য হত্যাকারী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, সরকারের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী তিনি সেন্ট লুসিয়ায় যাননি; বর্তমানে দুবাইয়েই রয়েছেন।

মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এ কথা বলেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বেনজীর কিলার, হাজার হাজার নেতাকর্মীকে তিনি হত্যা করেছেন। দেশ ও জাতির দুশমন তিনি। বেনজীর সেন্ট লুসিয়ায় যাননি, তিনি দুবাইয়ে আছেন।’

তিনি জানান, দুবাইয়ে থাকা বেনজীরকে নজরদারিতে রাখতে বাংলাদেশ দূতাবাস সতর্ক রয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য সরকার কাজ করছে।

হুমায়ুন কবির বলেন, মামলা ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ‘জঘন্য হত্যাকারীকে’ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী দেশে কারাগারে রয়েছেন, তাদেরও বিচার হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যেভাবে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হন বেনজীর

এর আগে গত ১২ জুন দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্য জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছিলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিষয়টি জানানো হয়।

এরপর ইন্টারপোলের মাধ্যমে বেনজীরের প্রত্যর্পণ চায় বাংলাদেশ। এ জন্য দুদকের প্রস্তুত করা প্রায় ১৪৪ পৃষ্ঠার নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে কূটনৈতিক মাধ্যমে দুবাইয়ে পাঠানো হয়। এতে তার বিরুদ্ধে থাকা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলার তথ্য ও প্রত্যর্পণের প্রয়োজনীয় নথিপত্র যুক্ত করা হয়েছিল।

পরে ২৭ জুলাই দুবাইয়ের একটি আদালত বেনজীরের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৩০ জুলাই তিনি কারামুক্ত হন। তখন তার সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগের ওপর বিধিনিষেধ থাকার কথা জানানো হয়েছিল।

তবে জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ১৭ আগস্ট তিনি দুবাই ছেড়ে সেন্ট লুসিয়ায় যান। মঙ্গলবার সংসদে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে অবশ্য এর বিপরীত তথ্য দেওয়া হয়েছে। ফলে বেনজীরের বর্তমান অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।