আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ত্রাণ, পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ও মানবিক সহায়তার জন্য নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে ১০ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাংলাদেশে নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভাণ্ডারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। এ সময় নেপালের জন্য বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া আর্থিক সহায়তার বিষয়টি জানান তিনি।
সাক্ষাৎকালে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের উদ্দেশে লেখা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি চিঠিও রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভাণ্ডারীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
উত্তর নেপালে সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ, পুনরুদ্ধার ও বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব কার্যক্রমে সহায়তা করতেই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই অনুদান দেওয়া হয়েছে।
নেপালের এই বিপর্যয়ে শুরু থেকেই সহমর্মিতা জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। গত ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নেপাল দূতাবাসে খোলা শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। এর আগে ২৭ আগস্ট নেপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে শোক জানিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে একটি শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
নিহত ১ হাজার ২২৫, নিখোঁজ প্রায় ৫ হাজার
নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ২২৫ জনে দাঁড়িয়েছে। বিপর্যয়ের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও দুই দেশ মিলিয়ে এখনো অন্তত ৪ হাজার ৭৫৭ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এতে উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে তীব্র মানবিক সংকট।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশটির অংশে ১ হাজার ২০৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২১৬ জন।
দেশটির সীমান্তবর্তী রসুয়া ও নুয়াকোট জেলাতেই প্রায় ১৬ লাখ মানুষ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একই সঙ্গে ভোতেকোশি নদীর একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকা পড়া কর্মীদের উদ্ধারে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও অভিযান চলছে। সুড়ঙ্গের মুখে জমে থাকা আবর্জনা ও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা।
অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম চায়না ডেইলির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক হড়পা বানে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪১ জন।
হিমবাহ ধস থেকেই ভয়াবহ বন্যা
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের লেন্দে উপত্যকায় লাংটাং লিরুং পর্বতের একটি বিশাল হিমবাহ ধসে নদীতে পড়ে। এর পরই সৃষ্টি হয় ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের। হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট প্রবল জলোচ্ছ্বাস ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদী দিয়ে নেমে এসে বিস্তীর্ণ লোকালয়ে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়।
হিমবাহ ধসের সময় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমদিকে সেটিকে ভূমিকম্প বলে মনে করা হলেও পরবর্তীতে ভূ-তাত্ত্বিকরা নিশ্চিত করেন, এটি হিমবাহ ধসের প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া কম্পন।
প্রলয়ঙ্করী এই বন্যায় নেপালের উত্তরাঞ্চলের ৪১টি কংক্রিটের সেতু পুরোপুরি ভেসে গেছে। শুধু নুয়াকোট জেলাতেই ধ্বংস হয়েছে ১ হাজার ২৬৭টি ঘরবাড়ি। বন্যায় যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বিপুল প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এমন বিপর্যয়ের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। সংকটের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।