২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্যকে ‘স্লোগান নয়, পরিকল্পনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রপ্তানি, বিনিয়োগ ও আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে চলতি দশকের মধ্যেই সরকার দেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, চুক্তি স্বাক্ষরের পর আইডিবি চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ সময় বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন আইডিবি চেয়ারম্যান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের নতুন সরকার এসেছে, বাংলাদেশের নতুন দিকনির্দেশনাও এসেছে। আমাদের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা। এটি কোনো স্লোগান নয়, এটি একটি পরিকল্পনা। রপ্তানি, বিনিয়োগ ও আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে আমরা এই দশকে আমাদের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করতে চাই।’
বাংলাদেশকে একটি উৎপাদনকেন্দ্র এবং এ অঞ্চলের প্রবেশদ্বারে পরিণত করার সরকারের লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের প্রথম প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। এখন ইলেকট্রনিকস, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল ও সবুজ শিল্পকে প্রবৃদ্ধির পরবর্তী চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন কারখানা চাই, যেগুলো কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং এমন কর্মসংস্থান চাই, যা মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করবে।’ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের কথা উল্লেখ করেন। হেলথ কার্ড চালুর প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান তিনি।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে অংশীদারত্বের গুরুত্ব বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ-আইডিবি সহযোগিতায় নতুন পদ্ধতি গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সহযোগিতা হতে হবে আরও উদ্ভাবনী, দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম, ফলাফলভিত্তিক ও বাংলাদেশের পরিবর্তিত উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অর্থায়নের উৎস হিসেবে আইডিবি ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাংলাদেশ আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রকল্পের অর্থায়ন চুক্তিকে মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প শুধু একটি জ্বালানি বিনিয়োগ নয়; এটি আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা ও দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির সক্ষমতায় বিনিয়োগ। তাই এটি শুধু একটি আর্থিক লেনদেন নয়, বাংলাদেশের ওপর আইডিবির আস্থারও প্রতিফলন।
চুক্তি অনুযায়ী, ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপ্যানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পে ১০০ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার অর্থায়ন দেবে আইডিবি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং আইডিবির কান্ট্রি প্রোগ্রামসের মহাপরিচালক আনাসে আইসামি চুক্তিতে সই করেন।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হবে।
এর ফলে পরিবেশবান্ধব ইউরো-৫ মানের জ্বালানি উৎপাদন বাড়বে, পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইডিবি চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের নেতৃত্বের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী তার পুনর্নির্বাচনে অভিনন্দন জানান। গত পাঁচ বছরে সদস্য দেশগুলোর জন্য ব্যাংকটির অর্জনের কথা উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্বিতীয় মেয়াদেও আইডিবি আরও বড় সাফল্য অর্জন করবে।
বাংলাদেশ আইডিবির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সদস্যপদ শুধু অর্থায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এটি আস্থা, সংহতি ও অভিন্ন লক্ষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আইডিবির ইসলামিক কনসেশনাল ফান্ড (আইসিএফ) প্রতিষ্ঠায় আল জাসেরের নেতৃত্বেরও প্রশংসা করেন তারেক রহমান। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে উন্নয়নশীল সদস্য দেশগুলোর জন্য স্বল্পব্যয়ের অর্থায়ন আরও বাড়াতে আইসিএফের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা ঢাকায় আইডিবির আঞ্চলিক হাবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রকল্প চিহ্নিত করতে কাজ করছেন।
সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সক্ষমতা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রেও আইডিবিকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বলেন, কোনো সদস্য দেশ জ্বালানি বা অবকাঠামোয় এগিয়ে থাকলে অন্য সদস্যদের সঙ্গে সেই সক্ষমতার সংযোগ ঘটাতে আইডিবি ‘সেতু’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে আইডিবি অনুদান, প্রকল্প ঋণ, বাণিজ্য অর্থায়ন, বেসরকারি খাতের অর্থায়ন ও রপ্তানি ঋণ নিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিয়ে আসছে। বাসস।