অসামরিক ও কল্যাণকর উদ্দেশ্যে পরিচালিত পারমাণবিক গবেষণা ও প্রকল্পসমূহ কোনো পরিস্থিতিতেই বন্ধ করবে না ইরান, এমন স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান মাসুদ পেজেশকিয়ান। বুধবার বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ সম্মেলনে প্রদত্ত আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় তিনি এই অনমনীয় মনোভাব প্রকাশ করেন।
বক্তব্য প্রদানকালে পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, মানবকল্যাণ ও বেসামরিক প্রয়োজনে নিউক্লীয় প্রযুক্তি প্রয়োগের ন্যায়সঙ্গত অধিকার তেহরানের রয়েছে এবং মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরাশক্তির এ সংক্রান্ত একাধিপত্য ইরান কখনই গ্রাহ্য করবে না। একইসঙ্গে নিজের সামুদ্রিক সীমায় জলযান চলাচলের সার্বভৌম কর্তৃত্ব অন্য কোনো শক্তির নিয়ন্ত্রণে সমর্পণ করা হবে না বলেও তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন।
ভাষণে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বৈরিতার প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে আলোচনায় আনেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। মিনাব অঞ্চলের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ক্রীড়াঙ্গনে সাধারণ মানুষের ওপর আমেরিকান সেনাদের প্রাণঘাতী আক্রমণের অভিযোগ তোলেন তিনি।
সেইসঙ্গে দেশটির প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গটিও তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে টানেন। পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেন, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে তেহরানের পরিচালিত প্রতিটি সামরিক তৎপরতাই মূলত অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ ছিল।
নিজের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সামরিক সামর্থ্যের আবশ্যকতা তুলে ধরে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, ওয়াশিংটনের আগ্রাসনের মুখে ইরান যখনই আত্মরক্ষায় নামে, তখনই তাকে বৈশ্বিক অঙ্গনে উগ্রবাদ ও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা ছড়ানোর অপবাদ দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করে ইরানি রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, যেখানে তেলআবিবের হাতে ব্যাপক বিধ্বংসী নিউক্লীয় সমরাস্ত্র থাকার গুরুতর প্রেক্ষাপট রয়েছে, সেখানে তাদের তৎপরতা কোনো নজরদারির আওতায় আনা হয় না। অথচ সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ কাজের পরও ইরানের গবেষণাগারগুলোকে বারবার কড়া আন্তর্জাতিক তল্লাশির মুখে ফেলা হচ্ছে। রক্তপাতের সাথে জড়িত থাকার পরও তেলআবিব দায়মুক্তি পেলেও অন্যায়ভাবে কেবল ইরানকেই আন্তর্জাতিক আর্থিক ও বাণিজ্যিক অবরোধের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে বলে তিনি আক্ষেপ করেন।
আমেরিকার শীর্ষ নেতৃত্ব ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রদত্ত সাম্প্রতিক ভাষণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে পেজেশকিয়ান সেটিকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও আধিপত্যকামী মানসিকতার নিদর্শন বলে আখ্যা দেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বহিরাগত চাপ ও ভীতি প্রদর্শনের কৌশল ইরানি জাতিকে বিচ্ছিন্ন করার বদলে আরও সুসংহত করবে এবং এমন অবিমৃশ্যকারী আচরণের জন্য ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনকে চড়া মূল্য ও অনুশোচনার মুখোমুখি হতে হবে।
জাতিসংঘের এই উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে সামগ্রিকভাবে পারমাণবিক প্রকল্পের স্বাধিকার, মার্কিন আগ্রাসনের সমুচিত জবাব এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধেই তেহরানের বলিষ্ঠ যুক্তি তুলে ধরেন দেশটির প্রেসিডেন্ট।
সূত্র : আল জাজিরা