জাতীয়
হামলা ও লুটপাটের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে দুই জাদুঘর, সংস্কার শেষে ফের চালুর তাগিদ
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সংগঠিত সহিংসতায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মারক কেন্দ্রগুলো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগের মুখে পড়ে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সংগঠিত সহিংসতায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মারক কেন্দ্রগুলো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগের মুখে পড়ে।
সেই উত্তাল সময়ে একাত্তরের গৌরবোজ্জ্বল ও বেদনাময় স্মৃতি বহনকারী দুটি বিশিষ্ট প্রদর্শনী কেন্দ্র মারাত্মক ধ্বংসলীলার শিকার হয়, যার একটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভূগর্ভস্থ স্বাধীনতা জাদুঘর এবং অন্যটি খুলনার গণহত্যা জাদুঘর। জাতীয় এই সম্পদগুলোতে আচমকা কেন হামলা চালানো হলো, তা নিয়ে সচেতন মহলে তৈরি হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া। বিশিষ্টজনদের মতে, প্রতিটি ইতিহাস প্রদর্শনী কেন্দ্রই কেবল অতীত ত্যাগের গল্প শোনায় না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে দিকনির্দেশনার আলো। যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষায় হাজারো মানুষ রাজপথে প্রাণ উৎসর্গ করল, তা মূলত একাত্তরের মুক্তিকামী সত্তারই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সেই চেতনার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে যদি ইতিহাসের আলো মুছে ফেলার অপচেষ্টা অব্যাহত থাকে, তবে সময়ের বিবর্তনে নতুন আন্দোলনের স্মারকগুলোও একদিন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে পারে।
পরিকল্পিত এই ধ্বংসযজ্ঞের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের আগস্টের শুরুতে খুলনার গণহত্যা জাদুঘরে তাণ্ডব চালায় একদল দুর্বৃত্ত। হামলায় ভবনটির প্রধান ফটকের কাচ ভেঙে চুরমার হলে পরবর্তীতে সুরক্ষার তাগিদে সেখানে অস্থায়ী টিনের বেড়া দেওয়া হয়। একাত্তরে চুকনগরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের পরিচালিত ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোত্তম গণহত্যার স্মৃতি ধরে রাখতেই '১৯৭১ গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর' গড়ে তোলা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের কাছে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা, অতি দ্রুত মেরামত কাজ সম্পন্ন করে এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে সাধারণ মানুষের পদচারণায় ফের মুখরিত করা হোক। এতে করে তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে উদীয়মান প্রজন্ম আমাদের আত্মত্যাগের সত্য ইতিহাস প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাবে। কেবল স্থানীয় ইতিহাস নয়, বরং সারা দেশ থেকে সংগৃহীত পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয়তার নানা প্রমাণ ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত রয়েছে এই জাদুঘরে, যার একটি বড় অংশ স্বপ্রণোদিত হয়ে তুলে দিয়েছিলেন শহীদদের পরিবার। সংগ্রহগুলোর বর্তমান অবস্থা ও সুরক্ষার প্রশ্নে ট্রাস্টের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মকবুল ইলাহী চৌধুরী জানান, ভেতরে থাকা উপাদানগুলোর নিয়মিত যত্ন নেওয়া হচ্ছে। যদিও হামলার সময় সামনের অংশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পূর্বে সেখানে সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারা থাকলেও পরবর্তীতে তা তুলে নেওয়া হয়। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া মাত্রই এটি আবারও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
একইভাবে টানা দুই বছর ধরে সর্বসাধারণের জন্য প্রবেশাধিকার বন্ধ রয়েছে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভূগর্ভস্থ স্বাধীনতা জাদুঘরটির। গত বছরের অগাস্টে দুষ্কৃতকারীরা প্রবেশ করে তাণ্ডব চালানের পাশাপাশি গ্যালারি ও বহিরাঙ্গনে অগ্নিসংযোগ ঘটায়। প্রদর্শনীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত ১২টি প্রকৃত আগ্নেয়াস্ত্র, যার মধ্যে ৪টি অস্ত্র তারা লুট করে নিয়ে যায়। অনিয়ন্ত্রিত তাণ্ডব ও আগুনে গ্যালারির প্রদর্শনী বাক্স, আলোকব্যবস্থা, পুরো বৈদ্যুতিক নেটওয়ার্ক, নজরদারি ক্যামেরা এবং আসবাবপত্রসহ পুরো অবকাঠামো পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিস্থিতি এবং পুনর্বাসনের বিষয় নিয়ে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক জানান, অস্ত্র চুরির ঘটনায় ইতোমধ্যে আইনানুগ মামলা দায়ের করা হলেও খোয়া যাওয়া চারটি অস্ত্র এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। প্রদর্শনীর অন্যান্য উপাদানের বড় অংশই ছিল ডিজিটাল ছবি ও ঐতিহাসিক নথি, যা মূল দলিল নয়। এই প্রেক্ষাপটে চলতি মাসের শেষ দিকে স্থাপনাটির কিছু অংশ খোলার প্রস্তুতি চলছে। দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শেষ করতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা পুরো প্রদর্শনী কক্ষকে নতুন রূপ দেওয়ার কাজ পরিচালনা করছেন।
মুক্তিযুদ্ধের অমোঘ স্মৃতির ওপর এই ধরনের হিংসাত্মক আঘাতকে কেবল সাধারণ অপরাধ হিসেবে না দেখে এর গভীরে থাকা সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে আনছেন দেশের জ্যেষ্ঠ সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাদের মতে, ইতিহাস ধারণকারী এমন সর্বজনীন স্থাপনাগুলো রক্ষা করা রাষ্ট্রযন্ত্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। গণহত্যা ও স্বাধীনতা জাদুঘরগুলো জাতির একটি নির্দিষ্ট ও সত্য আত্মপরিচয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যারা এসব জাতীয় সম্পদে আঘাত হেনেছে, তারা হয়তো অনুধাবন করেছে যে এই ইতিহাস থেকে জন্ম নেওয়া সাংস্কৃতিক শক্তি ও গণঐক্য তাদের সুবিধাবাদী রাজনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। নিজের কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ করতেই এই অশুভ তৎপরতা চালানো হয়েছে। যদিও কোনো স্বাধীন ভূখণ্ডে ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্র কখনো হামলার নিশানা হতে পারে না। এই জাতীয় স্থাপনাগুলো সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনে জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।