সোমবার, 5 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

শুল্কের চাপে দুর্বল দেশকে পণ্য কিনতে বাধ্য করছে যুক্তরাষ্ট্র: রেহমান সোবহান

কোনো রাষ্ট্রকে বলপ্রয়োগ করে নিজের পণ্য ক্রয়ে বাধ্য করার অর্থ দাঁড়ায়, সংশ্লিষ্ট পরাশক্তিটি স্বাভাবিক প্রতিযোগিতায় নিজস্ব পণ্যের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। মস্কোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের জেরে ব্রাজিল, কানাডা, চীন এমনকি ভারতকে চাপের মুখে রাখার দৃষ্টান্ত দিয়ে রেহমান সোবহান জানান, বাণিজ্যিক সক্ষমতার বদলে রাজনৈতিক পেশিশক্তির জোরে কৃত্রিম বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে।

শুল্কের চাপে দুর্বল দেশকে পণ্য কিনতে বাধ্য করছে যুক্তরাষ্ট্র: রেহমান সোবহান
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা পুনরায় ঔপনিবেশিক মানসিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি মন্তব্য করেন, উন্মুক্ত বাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা হারিয়ে ওয়াশিংটনের মতো পরাশক্তিগুলো করের বোঝা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোকে মার্কিন পণ্য গ্রহণে বাধ্য করছে।

শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিসঅর্ডার’ শীর্ষক কর্মশালায় তিনি এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান ব্যাখ্যা করেন, বৈশ্বিক লেনদেনে প্রাচীন ঔপনিবেশিক ছাঁচে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোনো রাষ্ট্রকে বলপ্রয়োগ করে নিজের পণ্য ক্রয়ে বাধ্য করার অর্থ দাঁড়ায়, সংশ্লিষ্ট পরাশক্তিটি স্বাভাবিক প্রতিযোগিতায় নিজস্ব পণ্যের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। মস্কোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের জেরে ব্রাজিল, কানাডা, চীন এমনকি ভারতকে চাপের মুখে রাখার দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি জানান, বাণিজ্যিক সক্ষমতার বদলে রাজনৈতিক পেশিশক্তির জোরে কৃত্রিম বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে।

তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাচ্যের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে রুখতে এটি পশ্চিমা বিশ্বের এক ধরনের অপ্রকৃতিস্থ প্রতিক্রিয়া। অতীতে ভৌগোলিক ভূখণ্ড জবরদখল করে পণ্যের বাজার কুক্ষিগত করা হতো, আর বর্তমানে ভূখণ্ড দখলের বদলে শুল্ক প্রাচীর ও বাণিজ্য কৌশল দিয়ে স্বাধীন বাজার ব্যবস্থার ওপর হস্তক্ষেপ চলছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এশিয়ার এই অভাবনীয় উত্থান সম্পূর্ণ মেধা ও উৎপাদনশীল প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে হয়েছে। বেইজিং, নয়াদিল্লি কিংবা সিউলের মতো শক্তিগুলো নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান গড়েছে। বর্তমান বিশ্বে অনুদান, বিনিয়োগ ও পুঁজির জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলো আর পাশ্চাত্যের মুখাপেক্ষী নয়। উনিশ শতকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাকিনলির বাণিজ্য সুরক্ষাবাদের নীতিকে টেনে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের জন্য এমন পুরোনো পথে হেঁটে শিল্প টিকিয়ে রাখার চেষ্টা এখন অকার্যকর, যা একই সাথে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো বহুপাক্ষিক কাঠামোর ভিত্তিকেও শিথিল করে দিচ্ছে। তবে ক্রয়ক্ষমতার মানে চীন ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনকে ছাড়িয়ে গেছে এবং চলতি মূল্যের মোট দেশজ উৎপাদনেও বেইজিং শীর্ষে চলে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে।

এশীয় অর্থনীতির এই জাগরণ ঢাকার জন্য প্রভূত সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলে মত দেন সিপিডি চেয়ারম্যান। চীন ও ভারতের মতো সুবিশাল অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা এখন পর্যন্ত ভৌগোলিক সুবিধার পূর্ণ সুফল তুলতে পারেনি। আমদানি পণ্যের বড় জোগান এশিয়া থেকে এলেও দেশের রফতানি বাণিজ্য গুটিকয়েক বাজারের ভেতরেই আটকে আছে। আঞ্চলিক উৎপাদন শৃঙ্খলের সাথে যুক্ত হয়ে নতুন বাজার দখলের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়ন স্তরে দক্ষতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

পদ্মা ও যমুনা সেতুর মতো অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর সুযোগ নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের সাথে কার্যকর স্থল সংযোগ স্থাপনের ভূকৌশলগত সম্ভাবনার কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। একই সাথে বিসিআইএম উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা এবং এশিয়ার স্থিতিশীলতার স্বার্থে বেইজিং-নয়াদিল্লির বৈরিতা দূরীকরণের ওপর জোর দেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে সৃষ্ট যুদ্ধের নেতিবাচক ধাক্কা বাংলাদেশেও এসে পড়ছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের পঞ্চম আসর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিভিন্ন রাষ্ট্রের দুই শতাধিক চিন্তাবিদ, তিন শতাধিক প্রতিনিধি এবং এক সহস্রাধিক সুধীজনের অংশগ্রহণে এই মহা আসরটি মুখরিত হয়ে ওঠে।