নেতৃত্বে নতুনদের সুযোগ তৈরি ও দলের ভেতরে জবাবদিহি বাড়ানোর লক্ষ্যেই প্রায় এক দশক আগে ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি গঠনতন্ত্রে যুক্ত করেছিল বিএনপি। কিন্তু ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও নীতিটির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত এখনও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ ধরে রেখেছেন বেশ কয়েকজন নেতা। এতে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত হয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। কারণ দলীয় একাধিক পদে থাকা কয়েকজন নেতা বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করছেন। একই সময়ে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর দলকে নতুন করে সাজানোর প্রক্রিয়াও চলছে।
গঠনতন্ত্রে ‘এক নেতা, এক পদ’
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলের গঠনতন্ত্রে ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে থাকার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি একই সময়ে জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা, পৌরসভা, ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক থাকতে পারবেন না।
এ ছাড়া দলের স্থায়ী কমিটি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ, জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সাংগঠনিক পদে থাকার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে।
এখনও একাধিক পদে বহু নেতা
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে এখনও অন্তত দুই ডজন নেতা একাধিক সাংগঠনিক পদে রয়েছেন।
এর মধ্যে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু একই সঙ্গে লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, দলের গঠনতন্ত্রে থাকা এই নীতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। কারণ তখন দলের অনেক নেতা কারাগারে ছিলেন, কেউ আত্মগোপনে ছিলেন। আবার অনেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছিলেন। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। ফলে এই নীতি বাস্তবায়নের সুযোগ হয়তো এখন দলের আছে।
তৃণমূলে বাড়ছে হতাশা
একাধিক পদে একই নেতাদের দায়িত্বে থাকার কারণে নতুন ও অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের সামনে নেতৃত্বে ওঠার সুযোগ কমছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের নেতাদের। দলের বিভিন্ন পর্যায় ও অঙ্গসংগঠনের প্রায় তিন ডজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন নেতা যদি দুই-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ ধরে রাখেন, তাহলে অন্যদের সামনে ওপরে ওঠার সুযোগ কমে যায়।
কুষ্টিয়া বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকার বলেন, নীতিটি বাস্তবায়ন করা হলে ভালো হতো। তাহলে অনেক যোগ্য নেতা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসার সুযোগ পেতেন।
পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি দুলাল ফকির বলেন, আমি এই নীতিকে পুরোপুরি সমর্থন করি। এতে দলের জন্য নিবেদিত নেতাকর্মীরা দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ পান। তা না হলে তাদের অনেকেরই কোনো পদে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
ছাত্রদলের ঢাকা উত্তর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ ইকবাল বলেন, এই নীতি বাস্তবায়ন হলে বিভিন্ন ইউনিটে বিভিন্ন নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বও উঠে আসবে।
মুন্সীগঞ্জের একটি ইউনিটের বিএনপি নেতার মতে, বর্তমানে দলের অভিজ্ঞ নেতার সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। তাই একই ব্যক্তির একাধিক পদ ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। নীতিটি কার্যকর হলে দলের অভ্যন্তরীণ হতাশা কমার পাশাপাশি আরও যোগ্য নেতাকে নেতৃত্বে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
আগেও উদ্যোগ, হয়নি পূর্ণ বাস্তবায়ন
‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি বাস্তবায়নে বিএনপি অতীতেও উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একাধিক পদে থাকা প্রায় ৬০ জন নেতার মধ্যে ৪৪ জন একটি পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে এরপর সেই প্রক্রিয়া আর উল্লেখযোগ্যভাবে এগোয়নি। দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এখনও একাধিক পদে রয়েছেন।
বিএনপির মহাসচিব হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দুটি পদ ছেড়ে দেন। একইভাবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পর যুবদলের সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তারেক রহমানও ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি আবার কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে সেই উদ্যোগও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
একাধিক পদে থাকা নিয়ে দলের ভেতরেই প্রশ্ন
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন নেতা যখন একাধিক সাংগঠনিক পদ দখল করে রাখেন, তখন অন্য অভিজ্ঞ বা নতুন নেতাদের জন্য পদ কমে যায়। এতে শেষ পর্যন্ত দলই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফলে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দল পুনর্গঠনের এই সময়ে ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি কার্যকর করা হবে কি না, সেটিই এখন বিএনপির অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।