প্রায় দেড়শ বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা দেশের চা শিল্পে উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতি থমকে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চা বাগানে দীর্ঘদিনের ‘মদের পাঠ্যা’ সংস্কৃতি ও বেকারত্বের চক্রই এই স্থবিরতার বড় কারণ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মদের সংস্কৃতি
বাংলাদেশের চা শিল্পের গোড়াপত্তন ব্রিটিশ আমলে, আর সেই সময় থেকেই বাগানভিত্তিক একটি বিশেষ সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়। ব্রিটিশ বাগান মালিকরা শ্রমিকদের দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করাতেন। দিনশেষে সেই শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে এবং শ্রমিকদের ‘চাঙ্গা’ রাখতে তাদের মধ্যে মদ্যপানের অভ্যাস গড়ে তোলা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; বরং শ্রমিকদের সচেতনতা কমিয়ে রাখা এবং প্রতিবাদের ক্ষমতা দুর্বল করার একটি কৌশল হিসেবেও মদের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা হয়েছিল। সেই ঐতিহ্য আজও অনেক চা বাগানে বিদ্যমান, যা শ্রমিকদের সামাজিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
মদ্যপান ও বেকারত্বের সম্পর্ক
বর্তমানে দেশে ১৬৭টি চা বাগানে প্রায় ৯ লাখ মানুষ বসবাস করে। এর মধ্যে প্রায় দেড় লাখ নিয়মিত ও অনিয়মিত শ্রমিক কাজ করেন। যদিও নতুন প্রজন্মের অনেকেই শিক্ষার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশ করছেন, তবুও বাগানের বড় একটি অংশ এখনও কুসংস্কার, কুশিক্ষা ও মদের নেশায় জড়িত। কিছু বাগানে এখনও ৫০-৫৫ শতাংশ মানুষ নিয়মিত মদ্যপান করেন বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, “যতদিন পর্যন্ত চা বাগান থেকে মদের পাঠ্যা বন্ধ করা না হবে ততদিন পর্যন্ত চা বাগানের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। নেশা ও সভ্যতা একসঙ্গে বসবাস করতে পারে না। যত দ্রুত সম্ভব বাগান থেকে মদের পাঠ্যা বন্ধ করতে হবে।”
‘মদের পাঠ্যা’ কী এবং এর বিস্তার
‘মদের পাঠ্যা’ বলতে অনুমোদিত দেশি মদের দোকান বা আড্ডাস্থলকে বোঝায়, যা বিশেষ করে চা বাগান এলাকায় প্রচলিত। মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন বাগানে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বৈধ মদের চেয়ে অবৈধ চোলাই মদের বেচাকেনা অনেক বেশি। অনুমান করা হয়, যেখানে ১০০ কেজি বৈধ মদ বিক্রি হয়, সেখানে প্রায় ১০০০ কেজি অবৈধ মদ বিক্রি হচ্ছে। সন্ধ্যার পর এসব কার্যক্রম বেড়ে যায় এবং এর প্রভাবে পারিবারিক সহিংসতাও বাড়ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানে ৪৫টি বৈধ মদের পাঠ্যা রয়েছে। এসব স্থানের পাশাপাশি অবৈধ মদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি।
কর্মসংস্থান সংকট ও কাঠামোগত সমস্যা
চা শ্রমিকদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বেকারত্ব। বাগান সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন কাজ করলে চার থেকে পাঁচজন বেকার থাকে। আইন অনুযায়ী শ্রমিক নিয়োগের নিয়ম থাকলেও তা মানা হয় না। ফলে বিপুল আবাদি জমি থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার না হওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, তাদের দাবি-দাওয়া উত্থাপন করলেই পুরনো আইনে মামলা দেওয়া হয়। তাদের মতে, “সরকার এবং চা বাগান মালিকরা চাইলে এই বেকারত্ব দূর করতে পারেন। তারা এটা না করে মদের বোতল হাতে ধরিয়ে দেয়। সরকারকে এই মদের পাট্রা বন্ধ করতে হবে।”
শিক্ষিত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরাও একই মত দিয়েছেন। তারা বলছেন, মদের কারণে অনেকেই বাগানের বাইরে কাজ করতে আগ্রহী নয়, ফলে বেকারত্ব বাড়ছে।
শ্রমিকদের দাবি ও ক্ষোভ
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, “বাগান থেকে বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা এখনো সৃষ্টি হয়নি। মদ ছেড়ে যদি শিক্ষার হার বাড়ানো যেত তাহলে বাগানে শিক্ষার হার অনেক বেড়ে যেত। কমলগঞ্জের আলীনগর চা বাগানে ১০০ জনের ওপর বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি চাকরিজীবী কাজ করেন।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কিছু এলাকায় মদ্যপানের হার কমছে। সরকার যদি কার্যকরভাবে মদের পাঠ্যা বন্ধ করতে পারে, তবে বেকারত্ব কমিয়ে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব।
প্রশাসনের অবস্থান
মৌলভীবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রাশেদুজ্জামান জানিয়েছেন, জেলায় ৪৫টি বৈধ মদের পাঠ্যা রয়েছে এবং অবৈধ মদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চা শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং শ্রমিকদের সামাজিক সংস্কার, শিক্ষা বিস্তার এবং মদের আসক্তি দূর করাই এখন সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জ।
সারাদেশ
চা বাগানে মদের অভিশাপ, বদলাচ্ছে না শ্রমিকদের জীবন
প্রায় দেড়শ বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা দেশের চা শিল্পে উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতি থমকে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চা বাগানে দীর্ঘদিনের ‘মদের পাঠ্যা’ সংস্কৃতি ও বেকারত্বের চক্রই এই স্থবিরতার বড় কারণ।