বৃহস্পতিবার, 22 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

দেশ রক্ষায় প্রস্তুত ইরান, প্রশাসনে চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি

মার্কিন সামরিক হামলার হুমকি অব্যাহত থাকায় ইরান জানিয়েছে, দেশ রক্ষায় তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। সামরিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে নানা প্রস্তুতি, পাশাপাশি সংঘাত এড়াতে আঞ্চলিক কূটনৈতিক যোগাযোগও জোরদার করেছে তেহরান।

দেশ রক্ষায় প্রস্তুত ইরান, প্রশাসনে চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত।

মার্কিন সামরিক হামলার হুমকি অব্যাহত থাকায় ইরান জানিয়েছে, দেশ রক্ষায় তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। সামরিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে নানা প্রস্তুতি, পাশাপাশি সংঘাত এড়াতে আঞ্চলিক কূটনৈতিক যোগাযোগও জোরদার করেছে তেহরান।

মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নেতারাও হামলা এড়ানো এবং ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরছেন। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার তুরস্কে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নিতে যাচ্ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তেহরান নিজেদের স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে কাজ করছে।

এর আগে গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন নেতৃত্বাধীন ‘আর্মাডা’ নামের একটি নৌবহর ইরানের সমুদ্রসীমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একই সময়ে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষও ধারাবাহিকভাবে প্রতিরক্ষার বার্তা দেন।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দেশটির আলোচক দলের ঊর্ধ্বতন সদস্য কাজেম গরিবাবাদি–এর উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, “তেহরানের অগ্রাধিকার এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করা নয়, বরং দেশ রক্ষায় ২০০ শতাংশ প্রস্তুতি রাখা।”

গরিবাবাদি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে এ বার্তাও জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি আলোচনা করার মতো থাকলেও ইরান প্রতিরক্ষায় পূর্ণ প্রস্তুতি বজায় রাখবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গত বছরের জুনে আলোচনার প্রস্তুতি চলার সময়ও প্রথমে ইসরায়েল এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছিল।

সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি আরও জোরালো

গত বছরের জুনের সংঘাতের পর থেকে ইরান সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ওই সংঘাতে দেশটির কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন এবং পারমাণবিক স্থাপনাও হামলার শিকার হয়। এরপর থেকেই নিয়মিত সামরিক মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান।

ইরানি সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়েছে, বাহিনীতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১ হাজার ড্রোন যুক্ত করা হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ‘ওয়ান-ওয়ে সুইসাইড ড্রোন’, পাশাপাশি যুদ্ধবিমান, নজরদারি এবং সাইবার-ওয়ারফেয়ারে সক্ষম ড্রোনও রয়েছে। এসব ড্রোন স্থল, আকাশ ও সমুদ্রে স্থির কিংবা চলমান লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে জানানো হয়।

এক বিবৃতিতে সেনাপ্রধান আমির হামাতি বলেন, বিদ্যমান হুমকির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত যুদ্ধ পরিচালনা এবং যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার লক্ষ্যে কৌশলগত সক্ষমতা উন্নত করা হয়েছে।

এদিকে আগেও ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা হামলা মোকাবিলার পাশাপাশি প্রয়োজনে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে ধারাবাহিকভাবে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম।

‘আমাদের মানুষ প্রাণ হারাবে’

তেহরানসহ পুরো ইরানে সাধারণ মানুষ ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে। একদিকে হুমকি, অন্যদিকে আলোচনার ইচ্ছা—দুই ধরনের বার্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলা কয়েকজন ইরানি নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন। তেহরানের এক তরুণী আলজাজিরাকে বলেন, “আমেরিকা আমাদের কিছুই করতে পারবে না। যদি তারা কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র সেটির কড়া জবাব দেবে। তাদের ঘাঁটিগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে।”

তবে ভিন্ন মতও রয়েছে। তেহরানের এক শিক্ষার্থী বলেন, “আরেকটি সংঘাত উভয় দেশের (ইরান ও ইসরায়েল) জন্যই ভয়ানক হবে। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষই এতে প্রাণ হারাবে।”
আর ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি বলেন, “যুদ্ধ শুরু হলে আমরা কেবল ধ্বংস আর বিপর্যয়ই দেখব। আমি আশা করি যেন এমন কিছু না ঘটে।”


প্রশাসনিক প্রস্তুতি: সীমান্ত প্রদেশে বিশেষ ক্ষমতা

যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কায় বেসামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোর গভর্নরদের কিছু বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছেন, যার মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে খাদ্যদ্রব্যসহ জরুরি পণ্য আমদানির সুযোগও রয়েছে।

আকাশপথে হামলার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গণ-আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তার দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। তেহরানের মেয়র আলিরেজা জাকানি বৃহস্পতিবার জানান, শহরের কর্তৃপক্ষ ‘ভূগর্ভস্থ পার্কিং শেল্টার’ নির্মাণকে অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প হিসেবে হাতে নেবে। তবে এটি সম্পন্ন হতে কয়েক বছর সময় লাগবে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে সংঘাত শুরু হলে বোমা হামলা থেকে আত্মরক্ষার বিকল্প সীমিতই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নতুন সংঘাত শুরু হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা আবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে—যেমনটি গত জুনের সংঘাত এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময় দেখা গেছে। তেহরানের এক তরুণী বলেন, শিগগিরই হয়তো বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভাঙার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তার ভাষায়, কিছুদিন আগেই বিক্ষোভে বহু মানুষের মৃত্যুর হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখতে হয়েছে, আর এখন যুদ্ধ না থাকলেও নিয়মিত মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে।