দীর্ঘদিন অস্বীকারের পর প্রথমবারের মতো গাজায় নিজেদের সামরিক অভিযানে প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার তথ্য স্বীকার করেছে ইসরায়েল। তবে এই সংখ্যার মধ্যে এখনো নিখোঁজ থাকা ফিলিস্তিনিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। পরদিন শুক্রবার দেশটির প্রায় সব প্রধান সংবাদমাধ্যম বিষয়টি প্রকাশ করে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে আকাশ, স্থল ও জলপথে গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। শুরু থেকেই গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়মিতভাবে হতাহতের তথ্য প্রকাশ করে আসছে। এসব তথ্যে নিহতদের সংখ্যা ছাড়াও তাদের নাম, বয়স, জন্মতারিখ এবং ইসরায়েল কর্তৃক ইস্যু করা পরিচয়পত্রের নম্বর পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়। মন্ত্রণালয়টি হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন হলেও জাতিসংঘসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের তথ্যকে সামগ্রিকভাবে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে আসছে।
তবে ইসরায়েল সরকার ও দেশটির সেনাবাহিনী এতদিন দাবি করে এসেছে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত হতাহতের সংখ্যা সঠিক নয় এবং এটিকে হামাসের ‘অপপ্রচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ইসরায়েলের উদারপন্থী দৈনিক হারেৎজ ছাড়া প্রায় সব সংবাদমাধ্যমই এতদিন নেতানিয়াহু সরকারের এই অবস্থান সমর্থন করেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাতে আল-জাজিরা জানিয়েছে, গাজা নগরী ও খান ইউনিসসহ বিভিন্ন এলাকায় শনিবার ভোর থেকে চালানো ইসরায়েলি হামলায় ৬ শিশুসহ অন্তত ৩১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গত বছরের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ৭১ হাজার ৭৬৯ জনে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৮৩ জন। এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা আরও হাজার হাজার মানুষের মরদেহ এখনো উদ্ধার হয়নি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাস ও গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় অন্তত ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন। একই সময়ে প্রায় আড়াই শ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে ইসরায়েলের এই আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তনের ফলে গাজায় দেশটির সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জাতিসংঘের একটি কমিশন, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং গবেষকেরা ইতোমধ্যে গাজায় ইসরায়েলের কার্যক্রমকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বেসামরিক নিহতের প্রশ্ন
নিরাপত্তা কর্মকর্তার ব্রিফিংয়ের পর ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজ প্রশ্ন তোলে—আর কোন কোন অভিযোগ ভবিষ্যতে সত্য বলে প্রমাণিত হতে পারে? পত্রিকাটির এক বিশ্লেষণে বলা হয়, এই বিলম্বিত স্বীকৃতি গাজায় ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে সরকার ও সেনাবাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়, তা ইসরায়েলের জনগণকে নিজেদের বিবেচনায় নিতে হবে।
এর আগে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছিল, তারা গাজায় ২২ হাজার ‘যোদ্ধা’কে হত্যা করেছে। এই দাবি সত্য ধরে নিলে মোট নিহত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি বেসামরিক মানুষ। এমনকি ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর একটি গোপন ডেটাবেজে নিহতদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই বেসামরিক বলে উল্লেখ ছিল।
টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, গাজায় নিহতদের প্রকৃত বেসামরিক সংখ্যা এখনো পর্যালোচনা করছে ইসরায়েল। অন্যদিকে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডেটাবেজে নিহতদের মধ্যে কে যোদ্ধা আর কে বেসামরিক—সে বিভাজন আলাদা করে দেখানো হয়নি।
রাফা ক্রসিং খোলার ঘোষণা
দেড় বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর আজ রোববার মিসর সীমান্তবর্তী রাফা ক্রসিং পুনরায় খোলার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী। ২০২৪ সালের মে মাসে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই ক্রসিংটি বন্ধ ছিল।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর (আইডিএফ) এক মুখপাত্র জানান, যেসব ফিলিস্তিনি আগে গাজা ছেড়ে গিয়েছিলেন, তারা এখন ফেরার জন্য আবেদন করতে পারবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি বাহিনী ক্রসিংটির তত্ত্বাবধান করবে। তবে গাজায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসরায়েলের সেনাদের হাতে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত ছিল রাফা ক্রসিং খোলা। যদিও এটি শুধু পদচারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, ফলে গাজায় খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা প্রবেশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র- দ্য গার্ডিয়ান