সোমবার, 26 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

গাজায় ৭ ত্রাণকর্মী নিহত: ইসরায়েলি হামলার পেছনে ছিল ‘হাফলা’ নীতি

সবচেয়ে বিতর্কিত বক্তব্যটি এসেছে হামলার নির্দেশদাতা নোচি মেন্ডেলের কাছ থেকে। তিনি বলেছেন, একই পরিস্থিতি আবার তার সামনে এলে তিনি একই সিদ্ধান্ত নেবেন।

গাজায় ৭ ত্রাণকর্মী নিহত: ইসরায়েলি হামলার পেছনে ছিল ‘হাফলা’ নীতি
(ওপরের সারির বাঁ থেকে) ব্রিটিশ নাগরিক জেমস হেন্ডারসন, জেমস কিরবি ও জন চ্যাপম্যান। (নিচের সারির বাঁ থেকে) ড্যামিয়ান সোবোল, জোমি ফ্র্যাঙ্ককম, জ্যাকব ফ্লিকিঙ্গার ও সাইফেদ্দিন আবুতাহা। ছবি: সংগৃহীত

গাজায় ত্রাণ বিতরণ শেষে ফেরার পথে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) তিনটি গাড়িতে থাকা সাত ত্রাণকর্মী নিহত হয়েছিলেন। এতদিন ঘটনাটিকে কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এটি শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার বিচ্ছিন্ন ভুলের ফল ছিল না। এর পেছনে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত বিতর্কিত একটি লক্ষ্য নির্ধারণ পদ্ধতি—‘ইনক্রিমিনেশন’ বা ‘হাফলা’ ভূমিকা রেখেছিল।

এই পদ্ধতিতে কাউকে সরাসরি হামাসের সদস্য হিসেবে শনাক্ত করার পাশাপাশি তার সঙ্গে কথা বলা, তার কাছাকাছি থাকা কিংবা কোনোভাবে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতেও তাকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ রয়েছে। গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গাজায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাতে ব্যাপক বিবেচনাধিকার থাকে।

২০২৪ সালের ১ এপ্রিলের ওই হামলায় নিহত হন তিন ব্রিটিশ নাগরিক জেমস কিরবি, জেমস হেন্ডারসন ও জন চ্যাপম্যান; অস্ট্রেলিয়ার জোমি ফ্র্যাঙ্ককম; পোল্যান্ডের ডামিয়ান সোবোল; ফিলিস্তিনি সাইফেদ্দিন আবুতাহা এবং দ্বৈত মার্কিন-কানাডীয় নাগরিক জ্যাকব ফ্লিকিঙ্গার। ডব্লিউসিকে জানিয়েছে, হামলার সময় তাদের কর্মীরা নিরস্ত্র ছিলেন। তাদের ব্যবহৃত গাড়িগুলোতেও সংস্থাটির পরিচয় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল।

ত্রাণবহরকে ঘিরে সন্দেহের সূত্রপাত

ঘটনার দিন গাজায় সমুদ্রপথে পৌঁছানো বিপুল পরিমাণ খাদ্য সহায়তা একটি গুদামে নিয়ে যায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন। সংস্থাটির দাবি, তাদের চলাচলের রুট ও সময়সূচি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল। পুরো যাত্রাটিই ছিল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের আওতায়।

গুদাম থেকে বের হওয়ার পর তিনটি গাড়িতে থাকা ডব্লিউসিকের কর্মীরা ফেরার পথে ছিলেন। তখন তারা ইসরায়েলি সেনাদের কাছাকাছি ছিলেন না এবং কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকিও তৈরি করেননি।

এর আগে অবশ্য ত্রাণবহরের সঙ্গে থাকা কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে ইসরায়েলি সেনারা হামাসের সদস্য বলে ধরে নিয়েছিল। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তিরা ত্রাণবহরকে লুটপাট থেকে রক্ষার দায়িত্বে থাকা স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন।

এই ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। হামলার নির্দেশ দেওয়া রিজার্ভ কর্নেল নোচি মেন্ডেল ওই সশস্ত্র ব্যক্তিদের সঙ্গে ডব্লিউসিকে কর্মীদের সাময়িক যোগাযোগকেও সন্দেহের কারণ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।

মেন্ডেলের ভাষায়, তারা হামাসের সদস্যদের সঙ্গে ‘মিশে গিয়েছিল’। তার ব্যাখ্যায়, এই ‘মিশে যাওয়া’র অর্থ ছিল কাছাকাছি থাকা, কথা বলা, একসঙ্গে থাকা কিংবা এ ধরনের যোগাযোগ।

সশস্ত্র ব্যক্তিদের উপস্থিতির কারণে পুরো ত্রাণবহরই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মেন্ডেল বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই।’ তার যুক্তি ছিল, নিহত ত্রাণকর্মীরা ‘নির্দোষ ছিলেন না’, কারণ তারা হামাসের সঙ্গে ‘সংযুক্ত’ ছিলেন।

‘হাফলা’ পদ্ধতিতে কীভাবে তৈরি হয় লক্ষ্য

গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে, সেটি হলো ‘হাফলা’ বা ‘ইনক্রিমিনেশন’ পদ্ধতি। এর অর্থ হলো কাউকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে এই পদ্ধতির মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কমান্ডাররা কোনো ব্যক্তিকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে শনাক্ত করতে পারেন।

তদন্তে দেখা গেছে, কোনো এলাকায় এই পদ্ধতি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা অনেক সময় লিখিত আদেশের মাধ্যমে নয়, বরং কমান্ডারদের মৌখিক ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জানানো হয়।

এ কারণে একই ধরনের পরিস্থিতিতেও কর্মকর্তারা ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আবার কোনো ব্যক্তিকে একবার ‘টার্গেট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তার সঙ্গে থাকা বা কাছাকাছি থাকা অন্য ব্যক্তিরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারেন।

গাজা ডিভিশনের যুদ্ধ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা রিজার্ভ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওরেন সলোমন গার্ডিয়ানকে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাতে এই ব্যবস্থার সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো গাড়িকে আগে থেকেই হামাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে ‘ইনক্রিমিনেট’ করা হলে সেখান থেকে কোনো ব্যক্তি বের হয়ে অন্য গাড়িতে উঠলেও সেই গাড়িটিও লক্ষ্যবস্তু হয়ে যেতে পারে। তার ভাষায়, ওই ব্যক্তির সঙ্গে থাকা অন্যরাও মারা যেতে পারেন এবং সেটিকে ‘ইনক্রিমিনেশন’ নীতির আওতায় সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না।

প্রথম আঘাতের পরও কেন হামলা চলল

ডব্লিউসিকের ত্রাণবহরে হামলা একটি মাত্র আঘাতে শেষ হয়নি। তিনটি গাড়িকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছিল, গাড়িগুলোর ভেতরে হামাসের সদস্য রয়েছে—এমন ভুল ধারণা থেকেই হামলা চালানো হয়েছিল। পরে আইডিএফ স্বীকার করে, ঘটনায় গুরুতর ভুল হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।

তবে গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে প্রশ্ন উঠেছে, প্রথম হামলার পর যখন গাড়ি থেকে লোকজন বের হয়ে আসেন এবং তাদের হাতে কোনো অস্ত্র দেখা যায়নি, তখন পরবর্তী দুটি হামলা কেন চালানো হয়েছিল?

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে মেন্ডেলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম হামলাকে ভুল শনাক্তকরণের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা গেলেও পরবর্তী হামলাগুলোর ক্ষেত্রে একই যুক্তি আর প্রযোজ্য নয়। কারণ, প্রথম হামলার পর গাড়ি থেকে বের হয়ে আসা ব্যক্তিদের কাউকেই অস্ত্রধারী দেখা যায়নি। ফলে তাদের পরিচয় নিশ্চিত না করে পরবর্তী হামলা চালানো সামরিক নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কথা।

তবে আরেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা গার্ডিয়ানকে বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি এমন ছিল যে অধিকাংশ সামরিক কর্মকর্তাই হয়তো একই সিদ্ধান্ত নিতেন।

তার হিসাবে, যোগ্য কর্মকর্তাদের ৯০ শতাংশ এমন পরিস্থিতিতে প্রথম বোমা ফেলতেন। দ্বিতীয় হামলার ক্ষেত্রেও ৯০ শতাংশ এবং তৃতীয় হামলার ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ কর্মকর্তা হামলা চালানোর সম্ভাবনা ছিল।

অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তার ভুল সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না—ওই কর্মকর্তার বক্তব্যে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আগেও ত্রাণবহরে হামলা চালানোর দাবি

নোচি মেন্ডেলকে গার্ডিয়ান প্রশ্ন করেছিল, গাজায় এর আগেও হামাসের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে বলে সন্দেহ করা ত্রাণবহরকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল কি না।

মেন্ডেল জানান, তার ইউনিট এ ধরনের বেশ কয়েকটি হামলার জন্য সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে প্রশংসা পেয়েছিল। তাদের বলা হয়েছিল, হামাসের ত্রাণ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা ঠেকাতে তারা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

তার মতে, ডব্লিউসিকে ঘটনার সঙ্গে আগের ঘটনাগুলোর মূল পার্থক্য ছিল—এবার বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটাই পুরো পার্থক্য। মৌলিক কোনো পার্থক্য নয়।’

মেন্ডেলের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। একই ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয় ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টি সামরিক বাহিনীর কাছে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। তাহলে ডব্লিউসিকে কর্মীদের মৃত্যু কি শুধু বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার কারণে বেশি আলোচিত হয়েছে?

ত্রাণের সঙ্গে হামাসের যোগসূত্রের ধারণা কীভাবে তৈরি

এর পেছনে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর আরেকটি সামরিক লক্ষ্য কাজ করছিল—হামাসের বেসামরিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধ্বংস করা।

গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলা কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে হামাস গাজার অধিকাংশ ত্রাণ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে অথবা ত্রাণবহর দখলে নিচ্ছে।

ফলে ত্রাণের আশপাশে কোনো সশস্ত্র ব্যক্তিকে দেখা গেলে সেটিকে হামাসের ত্রাণ দখলের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়।

তবে পরে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে এই ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বাস্তব পরিস্থিতি ছিল আরও জটিল। ইসরায়েলি অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে গাজায় ব্যাপক খাদ্যসংকট চলছিল। ত্রাণবহরে হামলা বা লুটপাটের ঘটনায় মরিয়া সাধারণ মানুষ, অপরাধী চক্র এবং হামাসের সশস্ত্র সদস্য—বিভিন্ন পক্ষই জড়িত ছিল।

অর্থাৎ, প্রতিটি সশস্ত্র ব্যক্তিকে হামাসের সদস্য হিসেবে ধরে নেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

হামাসের প্রশাসন ভাঙার লক্ষ্য ও ত্রাণবহর

মেন্ডেল নিজেই গার্ডিয়ানকে বলেন, গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অন্যতম মিশন ছিল হামাসের শাসনক্ষমতা ধ্বংস করা।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, হামাস-নিয়ন্ত্রিত ত্রাণ বিতরণে বাধা দেওয়াও সেই মিশনের অংশ ছিল। ফলে কোনো ত্রাণবহর হামাসের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে বলে মনে হলে সেটিকে সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কোনো ত্রাণ সংস্থা স্থানীয় নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র প্রহরী ব্যবহার করলে ওই নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সংস্থাটির কর্মীদের যোগাযোগ কি পুরো ত্রাণবহরকে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে?

গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে কথা বলা কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাস্তবে এমন আশঙ্কা ছিল।

ইসরায়েল বলছে, ত্রাণকর্মীরা হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল না

তবে গার্ডিয়ানের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।

আইডিএফ বলেছে, ডব্লিউসিকে কর্মীদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কোনো ইচ্ছা তাদের ছিল না। সেনারা ভুল করে গাড়িগুলোতে হামাসের সামরিক সদস্য রয়েছে বলে ধরে নিয়েছিল। পরে ওই ভুলের সঙ্গে গুরুতর প্রক্রিয়াগত ব্যর্থতাও যুক্ত হয়।

ইসরায়েলি সামরিক তদন্তে বলা হয়, ঘটনার জন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভুল এবং আদেশ-প্রক্রিয়া অনুসরণে ব্যর্থতা থাকলেও ফৌজদারি তদন্ত শুরুর মতো অপরাধের যৌক্তিক সন্দেহ পাওয়া যায়নি। এ কারণে সামরিক কৌঁসুলিরা ফৌজদারি কার্যক্রম না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

আইডিএফ আরও বলেছে, কোনো সশস্ত্র ব্যক্তির কাছে থাকা, তার সঙ্গে যোগাযোগ করা কিংবা তার সঙ্গে একই পথে চলার কারণে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ সামরিক লক্ষ্য হয়ে যায় না। মানবিক বহরকে লুটপাট থেকে রক্ষার জন্য নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মীরা অস্ত্র বহন করলেও শুধু এ কারণে তারা বৈধ লক্ষ্যবস্তু হয়ে যান না।

তদন্তের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান ডব্লিউসিকের

ইসরায়েলি সামরিক কৌঁসুলিদের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ডব্লিউসিকে। সংস্থাটি বলেছে, হামলার সময় তাদের কর্মীরা নিরস্ত্র ছিলেন এবং কারও জন্য কোনো হুমকি তৈরি করছিলেন না। তাদের গাড়িগুলোতে ডব্লিউসিকের চিহ্ন স্পষ্টভাবে ছিল। ইসরায়েলি বাহিনী তাদের গতিবিধি, পরিচয় ও মানবিক মিশন সম্পর্কেও আগেই জানত।

ডব্লিউসিকের অভিযোগ, ইসরায়েলি তদন্ত বিভিন্ন সময়ের ঘটনাকে একসঙ্গে মিলিয়ে এমন একটি বর্ণনা তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে মূল ঘটনার দায় অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংস্থাটি আবারও স্বাধীন ও তৃতীয় পক্ষের তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

২০২৪ সালের শুরুতেই ডব্লিউসিকে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছিল। তখন সংস্থাটি বলেছিল, তিনটি গাড়িতেই ডব্লিউসিকের চিহ্ন ছিল, সব গাড়িতে বেসামরিক কর্মী ছিলেন এবং ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের চলাচলের সমন্বয় করা হয়েছিল।

এক মাইলের মধ্যে তিন গাড়িতে একের পর এক হামলা

ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হামলার ধারাবাহিকতা।

ডব্লিউসিকের তিনটি গাড়িকে প্রায় এক মাইলের ব্যবধানে একাধিকবার আঘাত করা হয়। প্রথম হামলার পর গাড়ি থেকে বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা বের হয়ে এলেও তাদের উদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়নি। পরবর্তী হামলায় বহরের অন্য গাড়িগুলোও ধ্বংস হয়ে যায়।

ডব্লিউসিকের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির গাড়িতে থাকা কর্মীরা ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা একটি এলাকায় চলাচল করছিলেন। ডের আল-বালাহর একটি গুদাম থেকে খাদ্য সহায়তা নামিয়ে ফেরার সময় তাদের বহর আক্রান্ত হয়। ওই অভিযানে ১০০ টনের বেশি মানবিক খাদ্য সহায়তা গাজায় পৌঁছেছিল।

মেন্ডেল কি সত্যিই ‘ব্যতিক্রমী’ ছিলেন?

নোচি মেন্ডেল গাজা যুদ্ধে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরল একজন, যিনি তার কর্মকাণ্ডের কারণে বরখাস্ত হয়েছেন। এ কারণে ইসরায়েলি সামরিক কমান্ডের কিছু ব্রিফিংয়ে তাকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বা ‘নিয়মভঙ্গকারী’ কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মেন্ডেল একজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গাজায় মানবিক সহায়তার প্রবাহ সীমিত করার আহ্বান জানানো একটি চিঠিতে তার সই ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—মেন্ডেল যদি সত্যিই একজন ব্যতিক্রমী কর্মকর্তা হয়ে থাকেন, তাহলে একই পরিস্থিতিতে ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা প্রথম হামলা চালাতেন বলে তার এক সহকর্মী কেন মনে করেন?

এখানেই ‘ব্যক্তিগত ভুল’ আর ‘ব্যবস্থাগত সমস্যা’র মধ্যে পার্থক্যটি সামনে আসে।

সাত ত্রাণকর্মীর মৃত্যু যে বড় প্রশ্ন তুলেছে

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডব্লিউসিকে কর্মীদের হত্যার ঘটনাটি গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর বৃহত্তর চিত্রের অংশ হতে পারে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজা যুদ্ধে নিহতদের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি বেসামরিক। একই সময়ে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ‘কল্যাটেরাল ড্যামেজ’ বা অনিচ্ছাকৃত বেসামরিক প্রাণহানি মেনে নেওয়া, বড় এলাকাকে পরিবর্তনশীল ‘ফ্রি-ফায়ার জোন’ হিসেবে বিবেচনা করা এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে আবাসিক এলাকা ধ্বংস করার মতো কৌশল ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

এই বৃহত্তর ব্যবস্থার সঙ্গে ‘ইনক্রিমিনেশন’ নীতির সম্পর্কই গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়।

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি হামাসের যোদ্ধা হিসেবে শনাক্ত করার বদলে তার আচরণ, অবস্থান, যোগাযোগ কিংবা আশপাশের ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হলে বেসামরিক মানুষও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ঢুকে যেতে পারেন।

ডব্লিউসিকের সাত কর্মীর ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল কি না—গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান সেই প্রশ্নের জোরালো ভিত্তি সামনে এনেছে।

একই পরিস্থিতি হলে আবারও একই সিদ্ধান্ত নেবেন মেন্ডেল

সবচেয়ে বিতর্কিত বক্তব্যটি এসেছে হামলার নির্দেশদাতা নোচি মেন্ডেলের কাছ থেকে। তিনি বলেছেন, একই পরিস্থিতি আবার তার সামনে এলে তিনি একই সিদ্ধান্ত নেবেন।

মেন্ডেলের ভাষ্য, তিনি হামাসকে পরাজিত করতে গিয়েছিলেন এবং ঘটনাটিকে তিনি একটি ‘বোকামিপূর্ণ পার্শ্বঘটনা’ হিসেবে দেখেন। এমনকি সাতজন ত্রাণকর্মীর মৃত্যুকেও তিনি ‘গুরুতর ঘটনা নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তার এই বক্তব্যই পুরো ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে এনেছে। যদি ডব্লিউসিকে কর্মীদের মৃত্যু কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ভুল হয়ে থাকে, তাহলে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কেন বলেন—একই ঘটনা আবার ঘটলেও তিনি একই কাজ করবেন?

আর যদি মেন্ডেলের সিদ্ধান্ত সত্যিই ইসরায়েলি বাহিনীর প্রচলিত ‘ইনক্রিমিনেশন’ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্নটি শুধু সাতজন ত্রাণকর্মীর মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

প্রশ্ন দাঁড়ায়—গাজায় কতজন বেসামরিক মানুষ এমন একটি ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন, যেখানে কারও সঙ্গে কারও যোগাযোগ, একই জায়গায় থাকা কিংবা কোনো সশস্ত্র ব্যক্তির কাছাকাছি থাকার কারণেই তাকে ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে?

সেখানেই ডব্লিউসিকের সাত কর্মীর মৃত্যু একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনার বদলে গাজা যুদ্ধে বেসামরিক মানুষকে কীভাবে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে, তা নিয়ে আরও বড় বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান