২০২২ সালে নাসার পরিচালিত 'ডাবল অ্যাস্টেরয়েড রিডাইরেকশন টেস্ট' বা ডার্ট (DART) মিশন মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সাম্প্রতিক দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে যে, এই অভিযানের প্রভাব বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং কার্যকর ছিল।
কাইনেটিক ইমপ্যাক্টর ও ধ্বংসাবশেষের শক্তি
নাসার এই মিশনটি ছিল মূলত একটি 'কাইনেটিক ইমপ্যাক্টর' পদ্ধতির পরীক্ষা। ৫৬০ ফুট প্রশস্ত গ্রহাণু ডিমরফোসের গায়ে মহাকাশযানটিকে সরাসরি আছড়ে ফেলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু মহাকাশযানের ধাক্কাই গ্রহাণুটির গতিপথ পরিবর্তন করেনি, বরং ধাক্কার ফলে গ্রহাণু থেকে ছিটকে আসা বিপুল পরিমাণ পাথুরে ধ্বংসাবশেষ একে পেছনের দিকে একটি বাড়তি ধাক্কা বা 'থ্রাস্ট' দিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা একে বলছেন মোমেনটাম এনহ্যান্সমেন্ট ফ্যাক্টর। দেখা গেছে, এই ফ্যাক্টরের মান ছিল প্রায় ২। এর অর্থ হলো, মহাকাশযানের সরাসরি আঘাতের চেয়ে ধ্বংসাবশেষ ছিটকে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট পাল্টা ধাক্কা গ্রহাণুটির গতিপথ পরিবর্তনের শক্তিকে দ্বিগুণ করে দিয়েছিল।
কক্ষপথে সূক্ষ্ম কিন্তু সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন
ডিমরফোস এবং এর চেয়ে বড় গ্রহাণু ডিডাইমোস একটি যুগ্ম গ্রহাণু সিস্টেম হিসেবে মহাকাশে বিচরণ করে। ডার্টের আঘাতের ফলে এই পুরো সিস্টেমের কক্ষপথে পরিবর্তন এসেছে:
আবর্তনকাল হ্রাস: ডিডাইমোসকে কেন্দ্র করে ডিমরফোসের ১২ ঘণ্টার আবর্তনকাল প্রায় ৩৩ মিনিট কমে গেছে।
সূর্যকে প্রদক্ষিণ: এই যুগ্ম গ্রহাণু সিস্টেমটির সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময়কালও ০.১৫ সেকেন্ড কমেছে।
গতির পরিবর্তন: পুরো সিস্টেমটির কক্ষপথের গতি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১.৭ ইঞ্চি পরিবর্তিত হয়েছে।
নাসার বিজ্ঞানী থমাস স্ট্যাটলারের মতে, দীর্ঘ সময় ও বিশাল দূরত্বের বিচারে এই সামান্য পরিবর্তনই একটি ধ্বংসাত্মক গ্রহাণুকে পৃথিবী থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
পরিমাপের অনন্য পদ্ধতি: স্টেলার অকাল্টেশন
এত সূক্ষ্ম পরিবর্তন পরিমাপ করতে বিজ্ঞানীরা স্টেলার অকাল্টেশন (Stellar Occultation) পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। যখন কোনো গ্রহাণু দূরের কোনো নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন নক্ষত্রের আলো সাময়িকভাবে আড়ালে চলে যায়। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্বেচ্ছাসেবক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এরকম ২২টি ঘটনা রেকর্ড করেন, যার ওপর ভিত্তি করেই ডিডাইমোসের কক্ষপথের এই নিখুঁত তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি
এই মিশনের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ডিমরফোস মূলত একটি 'রাবল পাইল' বা আলগা পাথরের স্তূপাকার গ্রহাণু। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নাসা এখন পরবর্তী প্রজন্মের একটি শক্তিশালী টেলিস্কোপ তৈরি করছে। এটি মহাকাশের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা বিপজ্জনক গ্রহাণু ও ধূমকেতুগুলো অনেক আগেই শনাক্ত করতে পারবে, যা পৃথিবীকে মহাজাগতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।