মৌলভীবাজারের বড়লেখা পৌর শহরের হাজীগঞ্জ বাজারে পুলিশের অভিযানে ভারতীয় অবৈধ সিগারেটের পাশাপাশি ১৩টি বিক্রয় অনুমোদনবিহীন এয়ারগান ও বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধারের দাবি উঠেছে। তবে এসব এয়ারগান ও গুলির কোনো উল্লেখ নেই পুলিশের তৈরি করা জব্দ তালিকা কিংবা দায়ের করা মামলার এজাহারে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
যদিও পরে অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা এয়ারগান উদ্ধারের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে সরকারি নথিতে এসব আলামত কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
অভিযানে যা উদ্ধারের দাবি
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ জুন রাত আনুমানিক ১টার দিকে বড়লেখা পৌর শহরের হাজীগঞ্জ বাজারের জামিল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে অভিযান চালায় পুলিশ। বড়লেখা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) প্রলয় রায়ের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে ভারতীয় ২ হাজার ৮০০ শলাকা অওরিস সিগারেট, ১ হাজার শলাকা প্যাট্রন সিগারেট, ১০০ শলাকা সিগারস, ১৩টি বিক্রয় অনুমোদনবিহীন এয়ারগান এবং বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেন।
এ সময় দোকানের মালিক জামিল আহমেদ (৪১)-কে আটক করে পুলিশ।
মামলায় শুধু সিগারেট, নেই এয়ারগান ও গুলির তথ্য
অভিযানের পর এসআই প্রলয় রায় বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে জামিল আহমেদকে আসামি করে মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ২৪ (২৭ জুন)।
তবে মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেখানে শুধু ভারতীয় অবৈধ সিগারেট উদ্ধারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ১৩টি এয়ারগান কিংবা বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধারের কোনো তথ্য এতে নেই।
ফলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া গুরুত্বপূর্ণ এসব আলামত মামলার নথিতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
জব্দ তালিকাতেও উল্লেখ নেই এয়ারগান
আদালতে পাঠানো জব্দ তালিকা (জিডি নং-১১৩২, ২৬ জুন) পর্যালোচনা করেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।
জব্দ তালিকায় বলা হয়েছে, ২৭ জুন রাত ৩টা ২০ মিনিটে উদ্ধার করা মালামাল জব্দ করা হয়। সেখানে ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ কলামে তিন ধরনের ভারতীয় সিগারেটের বিবরণ রয়েছে। কিন্তু ১৩টি বিক্রয় অনুমোদনবিহীন এয়ারগান ও বিপুল পরিমাণ গুলির কোনো উল্লেখ নেই।
এ কারণে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যদি এসব আলামত সত্যিই উদ্ধার হয়ে থাকে, তাহলে তা সরকারি জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো না কেন।
অভিযানের সময় উপস্থিত থাকা বড়লেখা হাজীগঞ্জ বাজার বণিক সমিতির দুই সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পুলিশ ভারতীয় সিগারেটের পাশাপাশি ১৩টি এয়ারগান ও বিপুল পরিমাণ গুলিও উদ্ধার করেছিল।
তাদের দাবি, দোকানের মালিকের কাছে এসব এয়ারগান রাখার লাইসেন্স বা সরকারি অনুমোদনের কাগজপত্র চাওয়া হলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। পরে পুলিশ সিগারেটের সঙ্গে এয়ারগান ও গুলিও নিজেদের হেফাজতে নেয়।
তারা বলেন, পরবর্তীতে আদালতে পাঠানো জব্দ তালিকায় এসবের কোনো উল্লেখ না দেখে তারা বিস্মিত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের আরও দাবি, দোকান মালিক দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে অনুমোদনবিহীন এয়ারগান ও গুলির প্রচার এবং বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে আসছিলেন। তবে পুলিশের সরকারি নথিতে এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই।
তাদের বক্তব্যের অডিও রেকর্ড এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য
বিষয়টি জানতে বড়লেখা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) প্রলয় রায়ের হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বার্তা পাঠানো হয়। পরে তিনি টেলিফোনে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন।
এয়ারগান ও গুলি উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, "এয়ারগানে সরাসরি মামলা দেওয়া যায় না। তাই প্রথমে জব্দ তালিকায় এগুলো উল্লেখ করা হয়নি। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের জন্য আদালতের কাছে লিখিতভাবে মতামত চাওয়া হয়েছে।"
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় কোনো অভিযানে উদ্ধার হওয়া আলামত সাধারণত জব্দ তালিকায় উল্লেখ করে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। পরে ওই আলামতের আইনগত মূল্যায়ন, অপরাধের ধরন, তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম নির্ধারিত হয়।
এমন পরিস্থিতিতে কোনো উদ্ধারকৃত আলামত যদি জব্দ তালিকায় না থাকে, তাহলে সেটির অবস্থান, সংরক্ষণ এবং আইনগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি স্থানীয়দের
ঘটনার পর থেকে বড়লেখায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, অভিযানে উদ্ধার হওয়া আলামত যদি সত্যিই পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা মামলার এজাহার ও জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি কেন।
তারা এ বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এয়ারগান নিয়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞা
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জননিরাপত্তার স্বার্থে সরকার আগে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এয়ারগানের আমদানি, বিক্রয়, ব্যবহার ও বিপণনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও সরকারি অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশে এয়ারগান বিক্রি, বিপণন বা ব্যবসা পরিচালনা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।