ভারতশাসিত জম্মু ও কাশ্মিরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযানের পর এবার কথিত বাংলাদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাশ্মির উপত্যকা ও জম্মুতে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশি নাগরিকদের চিহ্নিত করে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সরকারি সূত্রের বরাতে বিবিসি নিউজ উর্দু জানিয়েছে, গত মে মাসে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি জম্মু ও কাশ্মির প্রশাসনকে জানায়, বাংলাদেশ থেকে আসা প্রায় ৬০০ অবৈধ অভিবাসী কয়েক বছর ধরে কাশ্মির ও জম্মুতে বসবাস করছেন। এর মধ্যে প্রথম ধাপে প্রায় ৩০০ বাংলাদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি, বাংলাদেশি নাগরিক ও রোহিঙ্গা মুসলিমরা গত কয়েক দশক ধরে জম্মু ও কাশ্মিরের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন। তাদের বড় একটি অংশ জম্মু অঞ্চলে অবস্থান করছেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তাদের অনেকেই ভিসা ছাড়াই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সরকারি কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, সোমবার ও মঙ্গলবার প্রায় ৩০০ বাংলাদেশিকে দুটি পৃথক দলে ভাগ করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেখান থেকে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
কথিত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক এই অভিযানকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারত সরকার রোহিঙ্গাদের আইনি শরণার্থীর মর্যাদা দেয় না। এর অন্যতম কারণ, ভারত ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি।
২০১৭ সালেও ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে আটক করে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এবার বাংলাদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের নীতির প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিজেপি ও দলটির সমর্থকদের দাবি, অবৈধ অভিবাসীদের উপস্থিতি বিশেষ করে জম্মু অঞ্চলে স্থানীয় সম্পদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় জনগণের জীবিকার সুযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রশাসনের আশঙ্কা, পরিচয়পত্রহীন ব্যক্তিদের চরমপন্থা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হতে পারে, যা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে মানবাধিকারকর্মীরা এসব যুক্তির সঙ্গে একমত নন। সাংবাদিক ও বিশ্লেষক হারুন রেশির মতে, আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হচ্ছে ‘নন রিভল্ট’, যার অধীনে কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যায় না, যেখানে তার জীবন বা স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে।
হারুন রেশি বলেন, বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীরা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। তাদের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্যানিটেশনসহ পর্যাপ্ত মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নেই। ভারত জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেশনে সই না করলেও সুপ্রিম কোর্ট বেশ কয়েকবার সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে বিদেশিদের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। ফলে প্রশাসনের এ উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ।